দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, মামলা আর রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। ক্ষমতায় ফেরার পর নতুন সরকারকে ঘিরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি দলীয় অন্দরেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে আরেকটি বিষয়—দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও প্রবীণ নেতাদের মূল্যায়ন।
সরকার গঠনের প্রথম ধাপে মন্ত্রিসভায় তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্বের প্রাধান্য দেখা যাওয়ায় এবং বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও ত্যাগীদের স্থান না হওয়ায় আলোচনা তৈরি হয়। অনেকের মধ্যে এ নিয়ে হতাশাও দেখা যায়।
তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। চলতি বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানে দলের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্র পরিচালনায় তারুণ্যের উদ্যম যেমন প্রয়োজন, তেমনি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক দক্ষতা, সংকট মোকাবিলা এবং নীতিনির্ধারণে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
সে কারণেই সরকারে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি করে সামনে এসেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন সরকার গঠন করেন। কিন্তু প্রথম মন্ত্রিসভায় দলের বহু প্রবীণ নেতা স্থান না পাওয়ায় দলটির নেত-কর্মীদের অনেকেই বিস্মিত হন। ২৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভার মধ্যে মাত্র ছয়জন ছিলেন, যারা অতীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো অভিজ্ঞ নেতারা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। মির্জা আব্বাসকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে বর্তমানে লন্ডনভিত্তিক তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা, সংস্কার এবং ৩১ দফা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের ওপর আস্থা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা আগের তুলনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র নেতার ভাষায়, ‘চেয়ারম্যান নিজেই যেন বয়স্কদের অবসরে পাঠাচ্ছেন।’
ত্যাগীদের প্রত্যাশা, মাঠের নেতাদের হতাশা
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা কঠিন সময় পার করেছেন। দলটির হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দেড় লাখ মামলা হয়েছে। আন্দোলন চালিয়ে নিতে অনেকে বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি করেছেন। এমনকি ঢাকায় রিকশা চালিয়েও অনেকে সংসার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যয় বহন করেছেন। আতঙ্কে অসংখ্য রাত কেটেছে ধানক্ষেতে, কবরস্থানে কিংবা খোলা আকাশের নিচে।
ক্ষমতায় ফেরার পর সেই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি—এমন অভিযোগ এখন দলের বিভিন্ন স্তরে শোনা যাচ্ছে। অনেকের দাবি, আন্দোলনের কঠিন সময়ে অনুপস্থিত থাকা কিছু ব্যক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন, অথচ দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা নেতারা এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলের হাল ধরে ‘বিএনপির আবাসিক নেতা’ বলে উপহাসের শিকার হওয়া রিজভীকে সরাসরি মন্ত্রী না করে কেবল ওই পদমর্যাদায় উপদেষ্টা করায় অনেকেই বিস্মিত হন। ফ্যাসিবাদী আমলে সাড়ে চারশ’ মামলার আসামি সোহেলকে এখনো কোনো পদে মূল্যায়ন করা হয়নি। তিন শতাধিক মামলার আসামি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও এখনো সরকারে কোনো মূল্যায়ন পাননি।
দলেও আসছে বড় পরিবর্তনের আভাস
সরকারের পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। বছরের শেষ দিকে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাউন্সিলকে ঘিরে নেতৃত্বে পরিবর্তনের জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও পরিবর্তনের আভাস দিয়ে বলেছেন, ‘আমার বয়স বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছি। এখন একটি পরিবর্তন দরকার।’ গুঞ্জন রয়েছে, দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ হতে পারেন পরবর্তী মহাসচিব।
একই সঙ্গে স্থায়ী কমিটিতেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। বয়সজনিত কারণে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও সেলিমা রহমানকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। বিপরীতে নব্বইয়ের দশকের ছাত্র আন্দোলনের অনেক নেতা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে ভূমিকা রাখা এবং জেল-জুলুমের শিকার কেউ কেউ আসতে পারেন সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে।
বাজেটের পরই মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, চলতি বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হতে পারে। সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও দীর্ঘদিনের রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চল থেকে মন্ত্রিসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ছয়বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলেই তরুণ ও প্রবীণ নেতৃত্বের মধ্যে একটি মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনীতিতে যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে আসছেন, তাতে আসন্ন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ সেই দূরত্ব ঘোচানোরই একটি সুস্পষ্ট বার্তা। রাজপথে রক্ত ঝরানো এই প্রবীণ ও ত্যাগী নেতারা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হলে দলের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেমন দূর হবে, তেমনি তা রাষ্ট্র সংস্কারেও এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আন্দোলন-সংগ্রামের ত্যাগী নেতাদের সরকারে মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সবেমাত্র সরকার গঠন হয়েছে। দেশ গঠনের কাজ চলমান। আশা করি একটা সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৭
সূত্র : বাংলানিউজ




