শৈশবের ভিত্তি যখন ভঙ্গুর, জাতির ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারে ? প্রাথমিক শিক্ষাই হোক জাতীয় অগ্রগতির মূল এজেন্ডা।

একটি জাতির পতন নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া।  ইতিহাসের এই নির্মম সত্যটি আজ আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতায় অত্যান্ত  প্রকট ও উদ্বেগজনক-ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আমরা উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার নামে যে বিশাল বাজেটের অবকাঠামো তৈরি করছি, তার আসল বুনিয়াদ যে প্রাথমিক শিক্ষা আর সেই প্রাথমিক শিক্ষার স্থরটিই দীর্ঘকাল ধরে চরম অবহেলার শিকার।


একজন মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো তার শৈশব, যেখানে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, ভাষার শুদ্ধতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত্ত্রিপ্রস্থর স্থাপিত হয়। অথচ বিগত বছরগুলোতে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার যে আধিপত্য চলেছে, তাতে শিশুর কৌতূহল ও সৃজনশীলতা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ অব পরিসংখ্যান ব্যুরো  এবং ইউনিসেফের সা¤প্রতিক তথ্যগুলো আমাদের এই ভয়াবহ পরিণতির দিকেই নির্দেশ করছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ১৪% থেকে ১৮% শিশু প্রাথমিক শিক্ষাকাল সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ছে। এই ঝরে পড়ার কারণ কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং বিদ্যালয়ের নিরানন্দ পরিবেশ ও মানহীন পাঠদান।

যেখানে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রম নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল চরম অব্যবস্থাপনা। বিগত দিনগুলোতে আমরা এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি চাপিয়ে দিয়েছি, যেখানে শিক্ষক-গণকে কেবল সিলেবাস শেষ করার যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ বা সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে শ্রেণি-কক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যে নিবিড় সম্পর্ক থাকার কথা ছিল, তা গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভীতি বা অনুৎসাহিত করার কারণে ছাত্ররা স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষার দর্শন যদি বিশ্লেষন করি, তবে দেখা যায় জাপানে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের কোনো একাডেমিক পরীক্ষা নেওয়া হয় না, কারণ তাদের লক্ষ্য হলো 'মানুষ গড়া। যেখানে সততা, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলাকে পাঠ্য-পুস্থকের চেয়ে বড় করে দেখা হয়।

ফিনল্যান্ডে শিক্ষকরা সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী এবং তারা প্রতিটি শিশুর ব্যক্তিগত স্বকীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন এক আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষা কোনো বোঝা নয়, বরং একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। নিউজিল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলার জন্য তারা 'প্লে-বেসড লার্নিং' বা খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার পদ্ধতি অনুসরণ করে, যা শিশুর মস্তিষ্ককে সু-গঠিত করে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর তাদের শিক্ষা-নীতিতে 'টিচ লেস, লার্ন মোর' বা 'কম পড়ান, বেশি শিখুন' নীতি গ্রহণ করে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যাতে তারা প্রতিটি শিশুর ওপর ব্যক্তিগত মনোযোগ দিতে পারেন।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গঠনগত এবং পদ্ধতিগত অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে,  যেমন,দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা ৬ বছরের হলেও তাদের ফোকাস থাকে অত্যান্ত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গণিত ও বিজ্ঞানের ওপর। সিঙ্গাপুরেও ৬ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা চালু আছে, তবে সেখানে অত্যান্ত সুনিয়ন্ত্রিত বিশ্বমানের পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে 'পিএসএলই' নামক একটি কঠিন জাতীয় পরীক্ষা নেওয়া হয়, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের শিক্ষার ট্র্যাক নির্ধারণ করে দেয়।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাধারণত ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে আইনগতভাবে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হলেও সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের মানে বড় পার্থক্য দেখা যায়। আবার ভিয়েতনামে প্রাথমিক শিক্ষা ৫ বছরের, যেখানে শিক্ষকের কঠোর প্রশিক্ষণ এবং গণিত ও পড়ার অভ্যাসের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে শিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক স্থরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার (১ম থেকে ৫ম শ্রেণী, ৫ বছর মেয়াদী) সাথে এই দেশগুলোর তুলনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল ও অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ৫ বছর মেয়াদী হওয়ায় তা ভারত ও ভিয়েতনামের সাথে হুবহু মিলে যায়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক এবং উভয় দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার মানেও একই ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশে আগে প্রচলিত সমাপনী পরীক্ষা পিএসি কিছুটা সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরীক্ষার মতো ছিল। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ যে নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে পরীক্ষার চাপ কমিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নের চেষ্টা করছে, তার মূল দর্শনটি জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বাস্তবতার নিরিখে পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের মূল অমিলটি রয়ে গেছে জিডিপির বরাদ্দ, অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের দক্ষতার জায়গায়। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় সবার অংশগ্রহণ  নিশ্চিত করতে পারলেও, সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের মতো যোগ্য শিক্ষক তৈরি এবং মুখস্থ নির্র্ভরতা থেকে বের হয়ে শতভাগ গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা নীতিগত ও কাঠামোগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কাছাকাছি হলেও, পূর্ব এশিয়ার উন্নত মডেলগুলোর গুণগত মানের সাথে এখনও পুরোপুরি মিলতে পারেনি।

এই বৈশ্বিক উদাহরণগুলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভুলগুলো হয়েছে, তা হলো আমরা শিক্ষা বলতে শুধু বইয়ের পাতাকে বুঝেছি, কিন্তু মানুষ গড়ার কারিগর যে শিক্ষক, তাদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের স্কুলগুলো অনেকটা সার্টিফিকেটের কারখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জীবনের শিক্ষা নেই। প্রাথমিক শিক্ষার এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথ হলো শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থরে উন্নীত করা, যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে গর্ববোধ করেন এবং শিশুদের মনে বিদ্যার সেই আগুন জ্বালাতে পারেন, যা ছাত্রজীবনে নয়, বরং আজীবন তাদের পথ দেখাবে।

পাঠ্যক্রম থেকে মুখস্থবিদ্যার বোঝা ঝেড়ে ফেলে সেখানে নৈতিকতা, জীবনবোধ ও সৃজনশীল কাজের বাস্তব পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রতিটি বিদ্যালয় হয়ে ওঠে আনন্দের একটি কেন্দ্রবিন্দু। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় বড় বাজেটের চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ করা সময়ের দাবি, কারণ শৈশবের ভিত্তি মজবুত না হলে উচ্চশিক্ষা কেবল একটি সার্টিফিকেট সর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

নীতি-নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর জীবনের প্রথম ৫-৬ বছরই নির্ধারণ করে দেয় সে ভবিষ্যতে কেমন নাগরিক হবে। এই সময়টুকু যদি আমরা অবহেলায় নষ্ট করি, তবে সেই দায়ভার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই আমাদের ক্ষমা করবে না। এখনই সময় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ্য ও নিবেদিত-প্রাণ শিক্ষক নিশ্চিত করা, শিক্ষার পরিবেশকে আধুনিকায়ন করা এবং আমাদের শিশুদের শৈশবকে শিক্ষার প্রকৃত আলোয় আনন্দময় করে তোলা তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা কখনোই বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না।

 

লেখক: হোসাইন আহমদ সুজাদ, সিনিয়র রিপোর্টার, একাত্তর টেলিভিশন, সিলেট অফিস।