ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স।

সিলেট রেলস্টেশন এলাকায় দখলকৃত সরকারি জায়গা উদ্ধারের পর ফের দখল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘদিনের অবৈধ দখল থেকে জায়গাটি উদ্ধার করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে পুনরায় দখলদারদের অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি জায়গা উদ্ধার ও সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে গাফিলতির অভাব রয়েছে। উদ্ধার করা জায়গা নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর নজরদারির অভাবে আবারও দখলের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় সচেতন মহল।

 


জানা গেছে, সিলেট রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের মূল্যবান জমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর অবৈধ দখলে ছিল। পরে সিলেটের জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ওই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা হয়। অভিযানের সময় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়। তবে সেই অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবারও ওই জায়গায় অবৈধভাবে দখল নেওয়া শুরু হয়।

 

রবিবার (১৯ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাওয়ার হোটেল থেকে শুরু করে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, টিকিট কাউন্টার, সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড- কী নেই এখানে? সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় বিশাল এলাকাজুড়ে নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে রেলের জমি অবৈধভাবে দখল করে। যুগের পর যুগ ধরে এখানে চলে আসছে দখলদারদের রাজত্ব। দখল হয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ জমি উদ্ধার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ স্থানীয়দের। সিলেটের শত শত একর রেলের জমি বেদখলে থাকলেও উচ্ছেদে নজর নেই রেল কর্তৃপক্ষের। মাঝে মাঝে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পরদিনই আবার দখলদাররা ফিরে আসে আগের জায়গায়।  

 

সূত্র জানায়, সিলেট রেলওয়ে স্টেশন বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম রেলস্টেশন। ভারতের আসামে চা বাগানের সম্প্রসারণ এবং চা রোপণকারীদের পরিবহন চাহিদার প্রেক্ষাপটে ১৮৯১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির মাধ্যমে বাংলার পূর্বাঞ্চলে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়ন করা হয়। বর্তমানে স্টেশন ও এর আশপাশে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে।

 

তবে রেলস্টেশন ছাড়া এসব সম্পত্তির বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ রেলের জমি দখল করে সেখানে টিনশেড, আধাপাকা ও কাঁচা ঘর নির্মাণ করেছেন। এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়ে তারা প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। এছাড়া রেলস্টেশনের প্রবেশপথসংলগ্ন রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড। দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ দখলের কারণে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে। ফলে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সম্ভাব্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

 

আবদুল কুদ্দুস (ছদ্মনাম) এক ব্যক্তি বলেন, আমার বাপ-দাদা এখানে বসবাস করেছেন। আমরাও বাস করছি। এ জায়গা নিয়ে রেলের সাথে মামলা রয়েছে। তবে তিনি কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি। গত কয়েকদিন আগে ডিসি অভিযান দিয়েছিলেন। ডিসি চলে গেলেন, আমরা তো থেকে গেলাম। আমরা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে পরিবার চালাই। আমরা এখানেই থাকবো।

 

স্থানীয় এলাকার ফায়জুল মিয়া নামের একজন বলেন, উদ্ধার করা জায়গায় আবারও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্নভাবে জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে। নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারির অভাবে দখলদাররা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে উচ্ছেদ অভিযানের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার উদ্যোগেও ভাটা পড়েছে।

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, কেবল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। উদ্ধার করা জায়গা যাতে পুনরায় দখল না হয় সে জন্য নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজন আছে। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় একই জায়গায় বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেও স্থায়ী সমাধান মিলবে না। বিশেষ করে, উদ্ধার করা সরকারি জায়গা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে জনস্বার্থে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুনরায় দখলের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

সিলেট রেলস্টেশনের ম্যানেজার মো. নূরুল ইসলাম সিলেটভিউকে বলেন, ‘সিলেটের রেলস্টেশনের সামনের জায়গাটি মূলত সড়ক ও জনপথের জায়গা। তবে; জায়গাটি সড়ক ও জনপথের হলেও রেলস্টেশনের সামনে থাকায় স্টেশনের সৌন্দর্য্য বিনষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া, এখানে ত্রিপল দিয়ে দখল করে দোকান-পাট করায় রেল যাত্রীদের অসুবিধা হচ্ছে। কারণ, এই দোকানগুলোতে বখাটেদের আড্ডা হওয়ার জন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুকিও থেকে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি, জেলা প্রশাসন অফিস থেকে পুনরায় দখল উচ্ছেদ করতে সড়ক ও জনপথে একটি চিটি দেওয়া হয়েছে।’

 

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন সিলেটভিউকে বলেন, ‘সিলেটের রেলস্টেশন এলাকার জায়গা পুনরায় দখল করে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বসানোর ব্যাপারে আমাদের জানা নেই। এরকম হলে তো স্টেশন ম্যানেজার আমাদের অবহিত করার কথা। কিন্তু আমরা আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এই বিষয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

 

এই বিষয়ে সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পূর্বের জেলা প্রশাসক থাকাকালীন সময়ে সিলেটের রেলস্টেশন এলাকায় দখল উদ্ধার অভিযান হলে সেটা তো আমি বলতে পারি না। আমি এই মুহুর্তে এই বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।’

 

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৬ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সিলেটের রেলস্টেশন ও আশেপাশের এলাকায় রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের বেদখল হওয়া জায়গা উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করছে সিলেট জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহমুদ আশিক কবিরের নেতৃত্বে এসব অভিযানে স্টেশন ও পার্শ্ববর্তী কদমতলী এলাকার সরকারি এবং রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ টং দোকান ও পাকা স্থাপনাসহ প্রায় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযানে সহযোগিতা করছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। এর আগে গত ১৪ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সিলেট রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম। তারও আগে, ৭ অক্টোবর রেলের জায়গা দখলকারীদের সরে যেতে নির্দেশ দেন তিনি।

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৮