সুস্থ মস্তিষ্ক সুন্দর জীবন : সবার জন্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক

 
প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ |


​আমার প্রাথমিক স্বাস্থ্য  চেম্বারে প্রতিদিন এমন অনেক মানুষ আসেন, যাঁদের অভিযোগ খুব সাধারণ মনে হলেও ভেতরটা বেশ জটিল মনজুরুল ভাই  মাথাটা ইদানীং একদম কাজ করছে না", "অল্পতেই জিনিসপত্র কোথায় রেখেছি ভুলে যাচ্ছি", "কাজে মনোযোগ দিতে পারি না" কিংবা "অস্থিরতায় রাতে দু'ঘণ্টাও ঘুম হয় না |


​বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা কিংবা তাঁদের পরিজনেরা এসব লক্ষণকে কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি কিংবা বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি বলে এড়িয়ে যান | 

 কিন্তু একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে যখন আমি এই লক্ষণগুলোকে সামগ্রিক শারীরবৃত্তীয়, খাদ্যভ্যাস ও জীবনযাত্রার আলোকে বিশ্লেষণ করি, তখন একটি নির্মম সত্য ভেসে ওঠে আমাদের সমাজের একটি বিশাল অংশ নিরবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বা 'ব্রেইন হেলথ'-এর জটিলতায় ভুগছে, যা সময়মতো নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হচ্ছে না |
​একটি সুস্থ, স্বাবলম্বী ও সুন্দর জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি কর্মক্ষম ও সুস্থ মস্তিষ্ক |  অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো স্নায়বিক বা ব্রেইন সংক্রান্ত ব্যাধিতে আক্রান্ত | স্ট্রোক, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম, মাইগ্রেন, এপিলেপ্সি (মৃগী রোগ) থেকে শুরু করে বিষণ্নতার মতো সমস্যাগুলো আজ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি | আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সংকটের রূপ আরও ভয়াবহ, কারণ এখানে সচেতনতার তীব্র অভাব এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত |

​পুষ্টি ও দৈনন্দিন অভ্যাস : মস্তিষ্কের সুরক্ষার প্রথম ও প্রধান প্রাচীর
​জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি সবসময় একটি কথা গুরুত্ব দিয়ে বলি চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ সর্বদা উত্তম এবং সাশ্রয়ী |
​ব্রেইন স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে আমরা প্রায়ই কেবল বড় কোনো স্ট্রোক বা জটিল নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি | অথচ শৈশব থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতা ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা ও জীবনযাত্রায় |

​মস্তিষ্কের ফুয়েল বা সঠিক খাদ্য উপাদান : আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২% হলেও, এটি শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০% ব্যবহার করে |

​ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড : দেশি সামুদ্রিক মাছ, রুই-কাতলা মাছের তেল, ইলিশ, বাদাম ও তিসিতে থাকা ওমেগা-৩ নিউরোনাল মেমব্রেন সচল রাখে |

​মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট : রঙিন শাকসবজি ও ফলে থাকা ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (বিশেষ করে B6, B9 বা ফোলেট, B12), ভিটামিন C এবং E ব্রেইনের ক্ষতিকর টক্সিন বা ফ্রি-রেডিকেল দূর করে |

​যা এড়িয়ে চলবেন : অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ট্রান্স-ফ্যাট ব্রেইনের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোতে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে, যা পরবর্তীতে স্ট্রোক ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় |

​শারীরিক সক্রিয়তা ও রক্ত সঞ্চালন : প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিটের মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম বা হাঁটা মস্তিষ্কে অলৌকিক প্রভাব ফেলে | এটি ব্রেইনে রক্তের প্রবাহ বাড়ায় এবং BDNF (Brain-Derived Neurotrophic Factor) নামক প্রোটিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা নতুন নিউরন তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে |

​পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্রেইনের 'বর্জ্য নিষ্কাশন ': রাতে ৭-৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম কেবল বিশ্রামের জন্য নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের 'গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম' (Glymphatic System) সক্রিয় হয়ে সারাদিনে জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন ও প্রোটিন বর্জ্য (যেমন বিটা-অ্যামাইলয়েড) পরিষ্কার করে | দীর্ঘদিনের অনিদ্রা অ্যালঝাইমার্স ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায় |

​মানসিক উদ্দীপনা ও সামাজিক বন্ধন : বই পড়া, নতুন ভাষা বা দক্ষতা শেখা, ধাঁধা মেলানো এবং স্বজনদের সাথে চমৎকার সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা মস্তিষ্কের 'নিউরোপ্লাস্টিসিটি' (Neuroplasticity) বা পুনর্গঠন ক্ষমতা বাড়ায় |

​তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছানো : 'অ্যাক্সেস ফর অল' কেন জরুরি ?

​প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করার সুবাদে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছি, গ্রামের বা প্রান্তিক অঞ্চলের একজন মানুষ যখন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন কিংবা তাঁর স্মৃতিভ্রমের লক্ষণ দেখা দেয়, তখন সঠিক রোগ নির্ণয় করতেই মাসের পর মাস পার হয়ে যায় | বিভাগীয় বা কেন্দ্রীয় শহরের বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায় |

​"সুস্থ মস্তিষ্ক সুন্দর জীবন : সবার জন্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক" এই প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের কৌশলগত ৩টি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে:
​১. প্রাথমিক স্বাস্থ্য  চিকিৎসক / প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা
​উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কর্মরত প্রাথমিক চিকিৎসকদের নিউরোলজিক্যাল ও মানসিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে |  টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বড় শহরের নিউরোলজিস্টদের সঙ্গে প্রান্তিক চিকিৎসকদের সমন্বয় ঘটাতে হবে |
​২. জীবনচক্রভিত্তিক পুষ্টি কৌশল (Life-cycle Approach to Nutrition)
​মস্তিষ্কের বিকাশ শুরু হয় মায়ের গর্ভ থেকেই | গর্ভাবস্থায় মায়ের অপুষ্টি, ফলিক এসিড বা আয়োডিনের ঘাটতি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে | তাই মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোকে আরও ব্যাপক ও তৃণমূলমুখী করতে হবে |
​৩. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও কুসংস্কার দূরীকরণ
​মস্তিষ্কের ব্যাধি বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে এখনো আমাদের সমাজে 'পাগলামি', 'জিনের আছড়' বা 'অভিশাপ' মনে করে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করা হয় | এই সামাজিক কুসংস্কার ভেঙে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার আওতায় সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার প্রয়োজন |


​মস্তিষ্ক কেবল শরীরের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ নয় এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্মৃতি, অনুভূতি ও পুরো অস্তিত্বের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র | 

পরিবারের একজন উপার্জনের পথপ্রদর্শক কিংবা প্রবীণ সদস্য যখন মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হারান, তখন কেবল ব্যক্তি একা নন, পুরো পরিবারটি আর্থসামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংসের মুখে পড়ে |

​অতএব, ব্রেইন হেলথ বা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে আর আলাদা কোনো বিলাসী বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই |

 ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো ব্রেইন হেলথকে (Brain  Health) ও আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান দিতে হবে |

​আসুন, সঠিক পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সচেতনতার মাধ্যমে নিজের মস্তিষ্কের যত্ন নিই এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত ব্রেইন হেলথ কেয়ার বা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করি |

কারণ, সুস্থ মস্তিষ্কই একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বাবলম্বী জাতির প্রধান ভিত্তি।

ম​নজরুল মা আবুদ: এমকম ( হিসাববিজ্ঞান) এমপিএইচ(পুষ্টিও স্বাস্থ্য)।