প্রশাসনের চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন কর্মকর্তা এক কর্মস্থল থেকে আরেক কর্মস্থলে যাবেন—এটাই নিয়ম। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা যদি কর্মদক্ষতা, সততা ও জনবান্ধব কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষের আস্থা অর্জন করেন, তাহলে তাঁর বদলি নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও স্বাভাবিক। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ লিখছেন, "অবশেষে সিলেটের পুলিশ কমিশনারকে সরানো হলো।" কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই তা-ই?
সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। অপরাধ, মাদক, চোরাচালান এবং ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে তিনি 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করেন। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা চিনি, জিরা ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান রোধে পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাদক ব্যবসায়ী ও ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান, ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রশংসা অর্জন করে।
শুধু অপরাধ দমনই নয়, নগর ব্যবস্থাপনাতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ, যানজট কমাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং জনভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নগরবাসীর কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি সেবার ক্ষেত্রেও তাঁর নেতৃত্বে চালু হওয়া 'জিনিয়া' অ্যাপ অনেক নাগরিকের জন্য দ্রুত আইনি সহায়তা পাওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
এমন একজন কর্মকর্তাকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়াকে কেউ কেউ নেতিবাচকভাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রশাসনিক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। পুলিশ কমিশনার এবং ডিআইজি—উভয়ই একই পদমর্যাদার হলেও দায়িত্বের পরিধি এক নয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতায় রয়েছে মাত্র ছয়টি থানা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতায় রয়েছে ১১টি জেলা এবং অসংখ্য থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও বিস্তীর্ণ প্রশাসনিক এলাকা। এত বড় একটি অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ প্রশাসনের নেতৃত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে অনেক বড় দায়িত্ব।
তাই এটিকে কোনোভাবেই 'সরিয়ে দেওয়া' হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একজন দক্ষ কর্মকর্তার ওপর আরও বৃহত্তর দায়িত্ব অর্পণের সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিষয়টিকে দেখা অধিক যৌক্তিক। প্রশাসনে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে কর্মকর্তাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্বের পরিধি, ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং প্রশাসনিক গুরুত্বের বিচারে চট্টগ্রাম রেঞ্জের নেতৃত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় আস্থার প্রতিফলন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে সেই মত যেন তথ্যভিত্তিক হয়, সেটিও জরুরি। কোনো কর্মকর্তার বদলিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে, তবে তা হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে।
সিলেটে কর্মরত অবস্থায় মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী যে অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম রেঞ্জেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। কারণ একজন দক্ষ কর্মকর্তার প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদবিতে নয়, তাঁর কাজের মধ্যেই ফুটে ওঠে।
দায়িত্ব বদলেছে, কর্মক্ষেত্র বদলেছে, কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা একই রয়েছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধ দমন এবং জনবান্ধব পুলিশিং। চট্টগ্রাম রেঞ্জে নতুন দায়িত্বে তিনি সেই প্রত্যাশা পূরণে সফল হবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




