বিএনপির সমমনা ও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী ১২ দলীয় জোটে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নৈশভোজের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জোটের শরিকদের মধ্যে টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে।
 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল (পিএনপি) এবং বাংলাদেশ এলডিপিকে (বিলুপ্ত) জোট থেকে বহিষ্কার করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা।
 


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দুই একদিনের মধ্যে জরুরি সভা ডেকে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সৈনিক লীগের নেতা কামাল উদ্দিন এবং বাংলাদেশ এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব নামধারী কামাল প্রধানের অংশগ্রহণ ব্যাপক প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কেননা, কামাল প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যাংক ও আদালতের সাথে প্রতারণা করা, জাল দলিল তৈরি, ভূমিদস্যু, মানব পাচারকারী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি খুলে চরিত্রহনন করা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অনেকগুলো মামলা রয়েছে। এমনকি একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিও তিনি। এ ঘটনা ১২ দলীয় জোটের ভেতরে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে।

জানা যায়, গত সোমবার (২০ জুলাই) বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণে যুগপৎ আন্দোলনের সমমনা মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।
 

অভিযোগ উঠেছে, ওই নৈশভোজে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যা জোটের নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তিকারী এবং অর্ধশতাধিক মামলার আসামি ও একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত চিহ্নিত প্রতারক হিসেবে পরিচিত কামাল প্রধান কীভাবে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও জোটের ভেতরে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।

এ ছাড়া পিএনপির চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটনের বিরুদ্ধেও বিগত সরকারের দোসর হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একাধিক ছবি সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
 

যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের মিত্ররা মনে করছেন, এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি জোটের মর্যাদা ও দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

তবে পিএনপির চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটন বলেন, আমি সেসময় শেখ হাসিনার সংলাপে অংশ নিয়েছিলাম। তবে নির্বাচনে তো যাইনি। বরং বিএনপি নির্বাচনে গিয়েছিল।

১২ দলীয় জোটের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, বিগত দিনের আন্দোলনে রাজপথে থাকা দলগুলোর মধ্যে এ ঘটনা নিয়ে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। জোটের শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। জরুরি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিতর্কিত দুই দলকে জোট থেকে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
 

এ বিষয়ে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন পারভেজ বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পর প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নৈশভোজের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আমাদের জোটের নেতৃবৃন্দ এটা নিয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রত্যেক দলের কাছে ফোন করে পাঁচজনের নাম চাওয়া হয়। আমি জোট প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দারকে অবহিত একটা লিস্ট বিএনপিকে দিয়েছি। কিন্তু নৈশভোজে অংশ নেওয়ার দিন সকালে সাংবাদিকরা ফোন করে বিভিন্ন ডকুমেন্টসহ কথা বলে যে, কামাল প্রধান নামে বাংলাদেশ এলডিপির একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি চিঠি পেয়েছে।

অথচ ওই লোক আওয়ামী লীগের দোসর এবং দুষ্কৃতিকারী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমসহ মরহুমা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও তার বিষোদগার ও কুৎসা রটানোর ডকুমেন্টস রয়েছে। এসব বিষয় আমাদের জোট প্রধানকেও পাঠিয়েছে। পরে জোট প্রধান আমাকে ও জোটের মুখপাত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহিউদ্দিন ইকরামের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলে।
 

তিনি বলেন, এরপর আমরা বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাইনি। একপর্যায়ে বিকেল পাঁচটার দিকে তাকে ফোনে পাওয়া যায়। পরে তাকে বলা হয় যে, আপনি কামাল প্রধান নামে যে লোককে চিঠি দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ডকুমেন্টস রয়েছে। আপনি যদি তাকে নিয়ে নৈশভোজে অংশ নেন তাহলে আপনাকেও গেটে আটকে দেওয়া হবে। তিনি ঢুকবেন না বলে জানান।

তবে আমাদের প্রশ্ন যে, একটা দলের এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এ ধরনের একজন দুষ্কৃতিকারীকে চিঠি দেওয়া এবং আমাকে আমাদের জোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা বলবো- জোটের ভাবমূর্তি নষ্ট করার তো কারো অধিকার নেই। জোট প্রধান আমাদেরকে মৌখিকভাবে তাৎক্ষণিক বলেছেন যে, ওদেরকে এখনই ডিলিট করে দাও।

১২ দলীয় জোটের সমন্বয় শামসুদ্দিন পারভেজ আরও বলেন, পিএনপির চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটনও আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে ছিল। তিনি ৫ আগস্টের পরে একটি প্রেক্ষাপটে আমাদের জোটে ঢুকেছে। আমাদের অপরিচিত মানুষ। কিন্তু উনার আচরণে আমরা জোটের সবাই মোটামুটি ক্ষুব্ধ। তারও কিছু ডকুমেন্টস পাওয়া গেছে। ফলে আমাদেরকে জোটপ্রধান মৌখিকভাবে আমাদের বলেছেন যে, ওদেরকে আর কন্টিনিউ করা যাবে না।
 

আরও জানা যায়, সৈনিক লীগের নেতা কামাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কোনো সাংবাদিক বা নাগরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে যাননি; তিনি গিয়েছিলেন ‘গণদল’ নামে একটি নামসর্বস্ব দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে।

এ বিষয়ে গণদলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা চৌধুরী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, কামাল উদ্দিন আমাদের দলের ভাইস চেয়ারম্যান। গত সোমবার জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। কামালের সৈনিক লীগ পরিচয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গোলাম মাওলা দাবি করেন, ‘কামাল উদ্দিনকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকার চট্টগ্রাম মহানগর সৈনিক লীগের আহ্বায়ক বানিয়েছিল।

এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার একাধিক নেতার ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
 

তারা জানান, দীর্ঘ দেড় দশক জেল, জুলুম ও মামলার শিকার হয়ে রাজপথে রক্ত দেওয়ার পর যদি সেই স্বৈরচারের দোসররা খোলস পাল্টে আমাদের নেতা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে গিয়ে বসার সুযোগ পায়, একসঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেওয়ার বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একদিকে লাখ লাখ নেতাকর্মীর ত্যাগ, হাজার হাজার নেতাকর্মীর রক্তসহ সার্বিকভাবে জিয়াউর রহমান ও মরহুমা খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনীতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। এ ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাগত দিক থেকে অশনিসংকেত।

উল্লেখ্য, ১২ দলীয় জোট হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘যুগপৎ আন্দোলন’-এর লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপির সমমনা ১২টি দল নিয়ে গঠিত তৎকালিন আওয়ামী সরকার-বিরোধী জোট। পূর্ববর্তী বিশ দলীয় জোট ভেঙে দিয়ে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোট গঠন করা হয়। পরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এই জোট ছাড়েন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৮