পূর্ব লন্ডনের ঐতিহাসিক ব্রিক লেন জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে। এ দুই দিন শনিবার ও রবিবার মসজিদ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। এমন তথ্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন কমিনিউটি ব্যক্তিত্ব রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ হরমুজ আলী।
জানা যায়, ব্রিক লেন জামে মসজিদের ভবনটির ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৭৪৩ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক এ ভবনটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমে এটি ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা হিসেবে নির্মিত হয়। পরবর্তীতে মেথডিস্ট চ্যাপেল এবং ১৮৯৮ সালে সিনাগগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭৬ সালে ভবনটি মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ব্রিক লেন জামে মসজিদ বর্তমানে শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং লন্ডনের বহু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
ঐতিহাসিক ভবনটির বেসমেন্ট একসময় বাণিজ্যিক গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সেখানে মহিলাদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ভবনটি ১৯৫০ সালে গ্রেড লিস্টেড বিল্ডিং হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় এর সংস্কার, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে সংরক্ষণমূলক বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মসজিদের ভেতরের বিভিন্ন কক্ষ পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়েছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৩০ জানুয়ারি ২০০৬ সালে ঐতিহাসিক ভবনটির মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইংলিশ হেরিটেজের মতামতের ভিত্তিতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও বিশপসগেট রিজেনারেশনের অর্থায়নে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে মিনারটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে এটি পূর্ব লন্ডনের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্যিক প্রতীক।
১৯৭৬ সালে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মুরব্বি, মুসল্লি ও শুভানুধ্যায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁদের অনেকেই ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম, আলহাজ্ব মতলিব চৌধুরী, আলহাজ্ব তয়বুর রহমান, আলহাজ্ব লোবদির আলী, আলহাজ্ব কারী এ. গনি, আলহাজ্ব এ. মতিন, আলহাজ্ব এ. হান্নান, আলহাজ্ব শামসুর রহমান, আলহাজ্ব মাসুদ আলী, আলহাজ্ব উস্তার আলী, মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বি.এ.বি.টি., আলহাজ্ব শামসুল হক, আলহাজ্ব আব্দুর রকিব, আলহাজ্ব মতিউর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, আলহাজ্ব জিল্লুল হক, আলহাজ্ব আতাউর রহমান চৌধুরী, আলহাজ্ব সাজ্জাদ মিয়া এমবিই, মোহাম্মদ আব্দুল কাদির, মোহাম্মদ হারুন আলী, হাজী মোস্তরী মিয়া ও মৌলভী আরশাদ আলীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মসজিদের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্তমানে প্রতি দুই বছর পরপর মসজিদ কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদে নিয়মিত তিন থেকে চার হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। শিশু-কিশোরদের জন্য হিফজ ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কোনো সরকারি অনুদান ছাড়াই মুসল্লিদের দান ও সহযোগিতায় মসজিদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
মসজিদের তিনটি ফ্লোরে ২০টিরও বেশি কক্ষ রয়েছে এবং ভবনটির বর্তমান আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড। সুন্নি আকিদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাঙালি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ মসজিদে পার্কিংয়ের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পবিত্র ঈদ ও শুক্রবারের জুমার নামাজের সময় মসজিদ কমিটির উদ্যোগে আশপাশের এলাকায় বিনামূল্যে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
ব্রিক লেন জামে মসজিদে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনীতিক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নিয়মিত পরিদর্শনে আসেন। তাঁদের মধ্যে রাজা তৃতীয় চার্লস, কুইন কনসোর্ট ক্যামিলা, আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি, জেরেমি করবিন, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মাইকেল হেসেলটাইন, লন্ডনের সাবেক মেয়র কেন লিভিংস্টন ও বর্তমান মেয়র সাদিক খানসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা রয়েছেন। বাংলাদেশ, সৌদি আরব, কুয়েত ও মিশরসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময়ে মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদের পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে মিনার নির্মাণ, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়ন ও সংস্কার এবং ফিউনারেল সার্ভিস চালুসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও মুসল্লি ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় মসজিদের ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সামাজিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, পূর্বসূরি মুরব্বিদের ত্যাগ, শ্রম ও অবদানের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত ব্রিক লেন জামে মসজিদের ৫০ বছরের গৌরবময় পথচলা সবার অংশগ্রহণে উদযাপন করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। আগামী ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বরের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান সফল করতে মুসল্লি, শুভানুধ্যায়ী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মুন্না/এসডি-২২




