​আমাদের জীবন এক নিরন্তর সিদ্ধান্তের যোগফল | সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়া পর্যন্ত, আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ছোট-বড় নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি | এই সিদ্ধান্তগুলোর কিছু সাময়িক প্রভাব ফেলে, আর কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের পুরো জীবনসত্তা, ভবিষ্যৎ এবং অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে | এমন একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং জীবনমরণ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্ত হলো আমরা কি বিষাক্ত ধোঁয়ায় নিজেদের নিঃশেষ করব, নাকি সবুজ নিশ্বাসে জীবনকে সতেজ রাখব ? এই সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ফুসফুস, আমাদের আয়ু এবং আমাদের আগামীর স্বপ্ন।

​জীবনদায়ী ফুসফুস এবং বিষাক্ত ধোঁয়ার আক্রমণ
​আমাদের বুকভরে নেওয়া প্রতিটি নিশ্বাস হলো জীবনের স্পন্দন | আর এই স্পন্দনকে সচল রাখে আমাদের ফুসফুস | ফুসফুস শরীরের এমন এক অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ, যা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে রক্তে পৌঁছে দেয় এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেয় | একটি সুস্থ ফুসফুস মানে একটি সতেজ, কর্মক্ষম জীবন 
​কিন্তু আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য এবং কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসের কারণে আমরা এই অমূল্য অঙ্গটিকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত ধোঁয়ার মুখোমুখি করছি | এই বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রধান এবং সবচেয়ে ভয়াবহ উৎস হলো ধূমপান।


সিগারেটের প্রতিটি টানে ফুসফুসে প্রবেশ করে হাজারো রকমের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, যার মধ্যে অন্তত ৭০টি সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী | এই বিষাক্ত ধোঁয়া ফুসফুসের স্বাভাবিক বায়ুথলিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়, শ্বাসনালীকে সংকুচিত করে এবং ধীরে ধীরে ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণ করার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলে।

​ধূমপান কেবল একজন ধূমপায়ীকে শেষ করে না, বরং এটি পরোক্ষ ধূমপানের (Passive Smoking) মাধ্যমে তার আশেপাশে থাকা অধূমপায়ী প্রিয়জনদেরও সমান ঝুঁকিতে ফেলে | একজন বাবা যখন তার সন্তানের সামনে ধূমপান করেন, তখন তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার সন্তানের নিষ্পাপ ফুসফুসে বিষাক্ত ধোঁয়া ঢুকিয়ে দিচ্ছেন | এই ধোঁয়া কেবল কাশি বা শ্বাসকষ্ট তৈরি করে না, এটি ডেকে আনে ফুসফুসের ক্যান্সার, সিওপিডি (COPD)-র মতো ভয়াবহ ও দূরারোগ্য ব্যাধি।

​সবুজ নিশ্বাস : সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি
​বিষাক্ত ধোঁয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ নিশ্বাস | সবুজ নিশ্বাস মানে কেবল বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণ নয় এটি একটি সুস্থ, সচেতন এবং বিষমুক্ত জীবনযাত্রার প্রতীক | যখন আমরা ধূমপান বর্জন করি এবং একটি সুস্থ পরিবেশে নিশ্বাস নিই, তখন আমাদের ফুসফুস পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারে |
​সবুজ নিশ্বাস আমাদের শরীরে প্রাণশক্তি সঞ্চার করে | এটি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের কর্মক্ষম ও দীর্ঘায়ু করে | একজন অধূমপায়ী বা ধূমপান ত্যাগকারী ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অনেক বেশি উপভোগ করতে পারেন | তাদের হাঁটাচলায় ক্লান্তি আসে না, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে তারা হাঁপিয়ে ওঠেন না এবং তাদের জীবন থাকে নিরোগ ও আনন্দময় |
​ধূমপান ত্যাগের অলৌকিক ক্ষমতা
​অনেক দীর্ঘমেয়াদী ধূমপায়ী মনে করেন, তারা বহু বছর ধরে ধূমপান করছেন, তাই এখন ছেড়ে আর কী লাভ ? এটি একটি ভুল এবং হতাশাবাদী ধারণা | চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আপনি যেই মুহূর্তে ধূমপান ত্যাগ করবেন, সেই মুহূর্ত থেকেই আপনার শরীর নিজেকে মেরামত করতে শুরু করবে | ধূমপান ত্যাগের উপকারিতা তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী :
​২০ মিনিট পর : আপনার হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।

​১২ ঘণ্টা পর : রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে এবং অক্সিজেনের মাত্রা বাড়বে |
​২ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস পর : আপনার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমতে শুরু করবে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত হবে |
​১ থেকে ৯ মাস পর : কাশি এবং শ্বাসকষ্ট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে | ফুসফুস নিজেকে পরিষ্কার করার ক্ষমতা ফিরে পাবে |
​১ বছর পর : হৃদরোগের ঝুঁকি একজন ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যাবে |
​৫ বছর পর : মুখগহ্বর, গলা এবং খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যাবে | স্ট্রোকের ঝুঁকি অধূমপায়ীর সমপর্যায়ে চলে আসবে |
​১০ বছর পর : ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি একজন ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যাবে।

​এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, ধূমপান ত্যাগের সিদ্ধান্ত কখনোই দেরিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয় | এটি একটি নতুন জীবনের সূচনা |
​সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই
​আমাদের সামনে দুটি পথ স্পষ্ট | একটি পথ বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, যা ধীরে ধীরে আমাদের ফুসফুসকে কালো করে দেয়, আমাদের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং আমাদের প্রিয়জনদের ঝুঁকিতে ফেলে | অন্য পথটি সবুজ নিশ্বাসে সতেজ, যা আমাদের দীর্ঘায়ু করে, সুস্থ রাখে এবং একটি আনন্দময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

​সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ আপনার | আপনি কি আপনার মূল্যবান ফুসফুসকে একটি জ্বলন্ত সিগারেটের ছাইদানিতে পরিণত করবেন ? নাকি একে সবুজ নিশ্বাসে ভরিয়ে তুলবেন ? আপনি কি আপনার প্রিয়জনদের একটি ধোঁয়াচ্ছন্ন, রোগাক্রান্ত ভবিষ্যৎ দেবেন ? নাকি একটি সুস্থ, নির্মল পরিবেশ উপহার দেবেন ?
​ধূমপান ত্যাগের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং মানসিক সংকল্প | 
প্রথম কয়েকদিন কিছু প্রত্যাহারের লক্ষণ (Withdrawal Symptoms) দেখা দিতে পারে, যেমন অস্থিরতা, মাথাব্যথা বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া | কিন্তু আপনার ইচ্ছাশক্তির কাছে এই লক্ষণগুলো খুবই সাময়িক | আপনি চাইলে আপনার চিকিৎসক বা পরিবারের সদস্যদের সহায়তা নিতে পারেন |

​জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত এবং অমূল্য |
এই সংক্ষিপ্ত জীবনকে বিষাক্ত ধোঁয়ায় নীল করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না | আসুন, আমরা আজই একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিই | আসুন, আমরা ধূমপানকে এবং সব ধরণের বিষাক্ত ধোঁয়াকে চিরতরে 'না' বলি | আসুন, আমরা সবুজ নিশ্বাসকে এবং একটি সুস্থ জীবনকে 'হ্যাঁ' বলি | আপনার এই একটি সঠিক সিদ্ধান্ত আপনার ফুসফুসকে বাঁচাবে, আপনার পরিবারকে রক্ষা করবে এবং আপনাকে একটি দীর্ঘ, সুস্থ ও নির্মল জীবন উপহার দেবে।

মনে রাখবেন, বিষাক্ত ধোঁয়া নয়, সবুজ নিশ্বাসই হোক আমাদের জীবনের সঙ্গী।

 

লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমকম (হিসাববিজ্ঞান), এমপি এইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।