দেড় দশক আগে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণের প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের ‘নেতৃত্বে’ দ্বিতীয় চেষ্টায় তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়ার কথা বলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই ঘটনায় সেনা হেফাজতে থাকা উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে তুলে নেওয়া হয়। এরপর তাদের আর খোঁজ মেলেনি।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশেই ইলিয়াস আলীকে ‘গুম’ করা হয়।
বিমান বাহিনীর তখনকার স্কোয়াড্রন লিডার সাইফুর রহমান সে সময় র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। আর তখনকার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান ছিলেন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিয়াউল আহসানকে যখন সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তিনি ছিলেন মেজর জেনারেল। সর্বশেষ তিনি ছিলেন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) মহাপরিচালক।
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের জামাতা সাইফুর সর্বশেষ বিমান সদর দপ্তরের ‘ডিরেক্টরেট অব এয়ার ট্রেনিং’ ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গত ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীর গুম ও হত্যার ঘটনায় সাইফুর রহমানের নাম আসে।
এরপর ২৬ জুলাই রাতে তার বাসা থেকে তাকে আটক করে বিশেষ সামরিক পুলিশ শাখা (প্রভোস্ট)। পরে তাকে বাহিনীর বিশেষ সেলে হেফাজতে রাখা হয়।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “প্রাথমিক তদন্ত ও সাক্ষীর জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীকে অপহরণের ঘটনায় উইং কমান্ডার সাইফুরের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদসহ এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্যদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।”
উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে আগামী রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আদেশ পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন চিফ প্রসিকিউটর।
কী বলেছেন ইমরুল কায়েস
আওয়ামী লীগের শাসন আমলে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে ঢাকার বনানীর আমতলী এলাকা থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ যখন নিখোঁজ হন সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী, তখন তিনি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সোচ্চার সমালোচক ছিলেন ইলিয়াস আলী। ২০০৯ সালে ভারতের প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সিলেট অঞ্চলে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
চলতি বছরের ২ এপ্রিল সরকারদলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে ইলিয়াস আলীকে ‘হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়ার’ প্রসঙ্গ তোলেন।
তিনি সেদিন দাবি করেন, ইলিয়াস আলীকে বনানী থেকে তুলে নেওয়া হয় র্যাব-১ সদর দপ্তরে, লাশ ফেলা হয় ধলেশ্বরীতে।
ইলিয়াস আলীকে কীভাবে ‘গুম’ করা হয়েছিল, গত ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বর্ণনা দেন জিয়াউল আহসানের মামলার সহযোগী সাক্ষী ইমরুল কায়েস।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউলের নির্দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে ‘হত্যা ও লাশ গুম’ করার বিবরণও তার জবানবন্দিতে উঠে আসে।
বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সেদিন জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় ইমরুল নিজেকে তার সাবেক ‘রানার’ হিসেবে পরিচয় দেন।
জবানবন্দির এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও গুম করার বিষয়ে কথা বলেন ইমরুল। তিনি বলেন, “২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই।
“কাকে গাড়িতে তুলবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। ‘টার্গেট’ কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, ‘টার্গেট’ আসবে না।”
পরে সেখান থেকে জিয়াকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে ইমরুল বলেন, পরের দিন সকালে তিনি নয় দিনের ছুটিতে চলে যান।
“ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। নয় দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি।”
প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, অস্ত্রের ‘ইন-আউট রেজিস্ট্রার’ এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ‘ফল ইন’ (লাইনে দাঁড়ানোর পর নাম ডেকে উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া) সকাল ৯টায় হত। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টায় ‘ফল ইন’ হত এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েক দিন ‘ফল ইনের’ সময় এসেছিলেন।”
সহযোগী এই সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, জিয়া এক দিন ফোনে কোনো একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
“ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেন- তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন। জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কী বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, স্যার আপনাদের কথামত ইলিয়াসকে ‘গলফ’ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে? এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।”
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-২৪
সূত্র : বিডিনিউজ




