ছবি: এআই।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। প্রতিদিনই মহাসড়কটিতে ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা। আর এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও। বেপোরোয়া চালকদের প্রতিযোগিতায় কখনও কখনও পুরো পরিবারকেই সেই বলি হতে হয়। কিন্তু তারপরও থেমে নেই এই মৃত্যুযাত্রা।

 


অনুসন্ধানে দেখা যায়, মহাসড়কে অনুমোদনহীন যানবাহনের চলাচল। বেপোরোয়া চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। ঘুম চোখে দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো কিংবা ক্লান্ত শরীরে দূর পাল্লার যাত্রীদের নিয়ে চলাচল। আবার অপ্রশস্ত ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ছয় লেন কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা; এসবই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আর সে কারণেই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু অনেক দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে চলাচল করে। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে চালকের পক্ষে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী অনেক যানবাহন যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ। তবুও চলছে দূরপাল্লার বাহন হিসেবে।

 

জানা গেছে, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ছয় লেনের কাজ চলছে ধীরগতিতে। ফলে এই রুটের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোলচত্বর, নারায়ণগঞ্জের অংশ ও হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ অংশ প্রায়শই যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সিলেট-ঢাকা ৬ ঘন্টার গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন সময় লাগে ৮-১২ ঘন্টা। অনেক ক্ষেত্রে ১২ ঘণ্টার বেশি সময়ও পেরিয়ে যায়। এতে চালকদের প্রায় দ্বিগুণ সময় গাড়ি চালাতে হয়। ঢাকা থেকে রাতে ছেড়ে আসা গাড়িগুলো সিলেট পৌঁছানোর আগেই অনেক চালকের তন্দ্রাভাব চলে আসে। আবার যানজটে সময় বেশি লাগায় সেটি পুষিয়ে দিতে মহাসড়কের সিলেট অংশে আসার পর চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। গতি বাড়িয়ে দেন গাড়ির। গন্তব্যে আগে পৌঁছাতে মহাসড়কে শুরু হয় সময় বাঁচানোর নামে জীবন নিয়ে প্রতিযোগিতা!

 

এদিকে সম্প্রতি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশ যেন মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ শনিবার (২২ আগস্ট) একটি তেলবাহী ট্রাক ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে বাবা-মা ও মেয়েসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত ৭ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরে সিলেটের ওসমানীনগরে দুইটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ বছরের শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। সব মিলিয়ে এসকল ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচার) পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে ২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ জন।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের নাগরিকরা জানান, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ছয় লেনের কাজ চলছে ধীরগতিতে। ধীর গতির এই কাজের জন্য মহাসড়কে গাড়ি চলাচলে ব্যাপক বিঘ্নতা ঘটছে। অন্যদিকে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্থার বেহাল দশায় গাড়ি চলাচলে গতি কমে যায়। আর সেই স্থবিরতার সময় পোষাতে বেপোরোয়া চালকরা দ্রুত গতির প্রতিযোগিতা শুরু করেন। আর সেই প্রতিযোগিতায় বলির পাঠা হন সাধারণ জনগন।

 

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন সিলেটভিউকে বলেন, ‘সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ছয় লেন কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। মহাসড়ক সংস্কারের জন্য সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। দ্রুত মহাসড়ক সংস্কারে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং অন্যসব দুর্ঘটনার কারণ দেখা গেছে, চালকদের বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং। এছাড়া মহাসড়কে থ্রী হুইলারের অবাধ চলাচলের জন্যও দুর্ঘটনা ঘটে।’

 

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় থাকা সত্বেও মহসড়কে কিভাবে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাসহ অনুমোদনহীন যানবাহন চলাচল করে সেটাই আমাদের প্রশ্ন প্রশাসনের কাছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক এখন মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে। কারণ এখানে গাড়ি চালানোর কোনো নিয়মনীতি তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ওভারস্পিড ও বেপোরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনাগুলো সংগঠিত হচ্ছে ও প্রানহানির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কেউই এই মৃত্যুগুলোর দায় নিচ্ছেন না। আইনের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। এজন্য দুর্ঘটনার ও হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, ‘আমরা গত সপ্তাহে মানববন্ধন করে ৬ দফা দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা বিশ্বাসকরি এই দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। এজন্য প্রশাসনকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।’

 

সুসাশনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সিলেটভিউকে বলেন, ‘সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে মাত্র ১৫ দিনে ১৪ জনের প্রাণহানি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নয়। অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, মহাসড়কে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও অনুমোদনহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থাই দায়ী। দীর্ঘ যানজটে সময় নষ্ট হওয়ার পর অনেক চালক সিলেটের দিকে এসে অতিরিক্ত গতি দিয়ে সময় পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সড়ক, যানবাহন ও চালক এই তিন ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

 

শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনায় চালকের অদক্ষতা, টানা গাড়ি চালানো-ই মূল কারণ। এছাড়া মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি চালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম ঠেকাতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। দুর্ঘটনা রুখতে সবার সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। হাইওয়ে পুলিশ খুব শিগগিরই একটি সচেতনামূলক গণসংযোগের আয়োজন করবে। আমরা ২/৩ দিনের মধ্যে এই জনসচেতনতা শুরু করতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের এসব দুর্ঘটনার সঠিক হিসেব অনেক সময় পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দুইপক্ষের সমঝোতার জন্য মামলা দায়ের হয় না।’

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ আশিক/ এহিয়া-০৭