ছবি: এহিয়া আহমদ।

প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় ও সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল সিলেট বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র। কিন্তু সংরক্ষণের বদলে অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত খাঁচা ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে সংরক্ষণকেন্দ্রটি যেন পরিণত হয়েছে প্রাণীদের মৃত্যুকূপে। ২০১৮ সালে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে ১১ প্রজাতির ৮৮টি দেশি-বিদেশি পশু-পাখি আনা হয়েছিল এই কেন্দ্রে। সেগুলোর মধ্য থেকে একে একে ৭৩টি প্রাণী মারা গেছে। এখন সেখানে টিকে আছে মাত্র ৬ প্রজাতির ১৫টি প্রাণী।

 


বিদেশি পশু-পাখি আনা হলেও তাদের চিকিৎসায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসক। ফলে যে কেন্দ্রের কথা ছিল প্রাণী রক্ষার, অব্যবস্থাপনায় সেই কেন্দ্রেই প্রাণ হারিয়েছে একের পর এক পশু-পাখি। এক কথায় বোবা এই প্রাণীগুলো বিভিন্নভাবেই খুন করা হয়েছে। তবে; এখন অবশিষ্ট পশু-পাখি রক্ষায় জমি অধিগ্রহণ করে প্রাণীগুলোর খাঁচা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।

 

সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে ১১২ একর জায়গা নিয়ে সিলেট নগরের টিলাগড়ে গড়ে তোলা হয় ‘টিলাগড় ইকোপার্ক’। ঘনসবুজে আচ্ছাদিত এই বনে রয়েছে নানা জাতের বৃক্ষরাজি। বনটিতে একসময় উড়ে বেড়াতো বনমোরগ, ময়না, টিয়া, ঘুঘু, মাণিকজোড়, কালিম, কাঠঠোকরা, হুতুমপেঁচাসহ বিভিন্ন জাতের পাখি। দেখা মিলতো বানর, শুকর, খেঁকশিয়াল, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, খরগোশ, কাঠবিড়ালী ও বেজির। নানা জাতের সরীসৃপেরও অভয়ারণ্য ছিল ইকোপার্কটি। ২০১৮ সালে ইকোপার্কটিতে ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র’ নামে গড়ে তোলা হয় মিনি চিড়িয়াখানা। ওই বছরের অক্টোবরে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে আনা হয় ১১ প্রজাতির ৮৮টি প্রাণী।

 

এর মধ্যে ছিল ৯টি হরিণ, ১৮টি কইকার্প, ২টি গ্রে প্যারট, ৪টি খরগোশ, লাভবার্ড ৩০টি, ময়ূর ১২টি, জেব্রা ২টি, সিলভার ফিজেন্ট ৩টি, গোল্ডেন ফিজেন্ট ১টি, সানকনুর ৪টি ও মেকাউ ৩টি। বিদেশি পশুপাখি আনা হলেও সংরক্ষণকেন্দ্রটিতে কোন ভেটেরিনারি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে বছর ঘুরার আগেই শুরু হয় পশু-পাখির মৃত্যুর ঘটনা। শব্দ দূষণ এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরম সহ্য করতে না পেরে মরতে থাকে পশু-পাখিগুলো। 

 

বর্তমানে সংরক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছে ৬-৮টি হরিণ, গ্রে প্যারট ২টি, ময়ূর ২টি, সিলভার ফিজেন্ট ১টি, মেকাউ ৩টি ও অজগর সাপ ১টি। গেল এক বছরে অন্তত ১০টি হরিণ, ২টি গ্রে প্যারট, ১টি ময়ুর, ৬টি রঙিণ কার্প ও ২টি কালিম মারা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মারা যাওয়া ছাড়াও সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে হরিণ চুরিও হয়েছে।

 

সরেজমিনে সিলেট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রে ঢুকতেই চোখে পড়ে অনিয়মের চিত্র। বনবিভাগের ইজারাদার মেসার্স জালাল এন্টারপ্রাইজ দর্শনার্থী ফি ২৩ টাকার পরিবর্তে আদায় করছেন ৩০ টাকা। বাড়তি টাকা নেওয়ার ব্যাপারে কোন সদুত্তর নেই তাদের। বাড়তি ফি নেওয়া দুঃখজনক মন্তব্য করলেও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমানের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কোন আশ্বাস মিলেনি।

 

ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, মেকাও, সিলভার ফিজেন্ট ও গ্রে প্যারটের খাঁচার ভেতর জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। মেকাও ও গ্রে প্যারটর খাঁচার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে কাঠবিড়ালী। মাঝে মধ্যে পাখিগুলোর দিকে কাঠবিড়ালী তেড়ে আসছে। ভয়ে খাঁচাজুড়ে উড়ছে পাখিগুলো। ময়ূর ও অজগরের খাঁচার ভেতরের পরিবেশ আরও অপরিচ্ছন্ন।

 

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান জানান, যারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি স্থাপন করেছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব ছিল। প্রাণীগুলোর বেষ্টনি সুচিন্তিতভাবে করা হয়নি। স্থানটিও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ছিল না। বর্তমানে সংরক্ষণ কেন্দ্রের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী বন্যপ্রাণীকেন্দ্রের পাশে ১০ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। পরে প্রাণীগুলোকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে পশু-পাখির মৃত্যু হার কমবে।

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-১৪