ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স ও এআই।

সিলেট মহানগরীতে আবারও ফিরেছে বিশৃঙ্খলা। একদিকে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসেছেন হকাররা, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রধান সড়কে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যত্রতত্র সিএনজি অটোরিকশা পার্কিং ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত। বাড়ছে যানজট, তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।

 


ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নগর প্রশাসনে এক ধরনের অচলাবস্থার সুযোগে নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলের প্রবণতা শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সিলেটের তিন কর্মকর্তার সিলেটে সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম, সাবেক পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকারের অভিযানের ফলে সাময়িক সময় তা কম হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিলেটসহ দেশের বিভিন্নস্থানে নতুন করে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর ঠিক এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কুচক্রি মহল তাদের ফায়দা হাসিলে ফের বেপোরোয়া হয়ে ওঠে।

 

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট মহানগরীর নির্ধারিত স্থান ছেড়ে ফের সড়ক ও ফুটপাতে বসতে শুরু করেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এখন ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার একাংশও দখল করে চলছে মাছ, মাংস, সবজি, ফল, কাপড়সহ নানা পণ্যের ব্যবসা। মহানগরীর তালতলা পয়েন্ট থেকে বন্দরবাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে রিকশা-ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের পসরা নিয়ে বসেছেন হকাররা। বন্দরবাজার থেকে রংমহল টাওয়ারের সড়কের পাশেও দেখা গেছে একই চিত্র। মধুবন মার্কেটের সামনে থেকে জেলরোড, কোর্ট পয়েন্ট থেকে চৌহাট্টা এবং জিন্দাবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাতের ওপর হকারদের উপস্থিতি বেড়েছে।

 

নগরীর লালদিঘীরপাড়ে নির্মিত অস্থায়ী হকার মার্কেটেও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি রয়েছে। তবে সরেজমিনে মার্কেটটির অর্ধেকের বেশি দোকান খালি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার বরাদ্দ পাওয়া দোকানে বসার পাশাপাশি কেউ কেউ রাস্তায়ও ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

এদিকে হকারদের পাশাপাশি নগরীর যানজট ও জনভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, টমটম ও মিশুক। সিলেট মহানগরীতে এসব যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এখন আবারও প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবাধে চলাচল করছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, গলি-উপগলি থেকে বেরিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো এখন প্রধান সড়কেও চলাচল করছে। অনেক চালক ট্রাফিক আইন না মেনে হঠাৎ মূল সড়কে উঠে আসছেন, উল্টোপথে চলছেন কিংবা যত্রতত্র মোড় নিচ্ছেন। এতে অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, এছাড়া জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, জেলরোড, আম্বরখানা ও সুবিদবাজারের প্রধান সড়কেও এসব যানবাহনের চলাচল বেড়েছে। দক্ষিণ সুরমার আলমপুর থেকে ক্বীনব্রিজ মোড়, পাঠানটুলা থেকে মদিনা মার্কেট, চন্ডিপুল থেকে হুমায়ুন রশীদ চত্বর, কলাপাড়া বেতের বাজার থেকে জিতু মিয়া পয়েন্ট এবং ক্বীনব্রিজ মোড় থেকে চন্ডিপুল পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চলাচল দেখা যাচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।

 

নগরবাসীর অভিযোগ, প্রশিক্ষণহীন চালকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এসব যানবাহনের চলাচল অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

 

হকারদের ফুটপাত দখলের পেছনে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের কিছু ব্যক্তি এবং সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ফুটপাত দখল হয়ে থাকে- এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নগরীর ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। আগের সময়ে যারা চাঁদা তুলতেন, তাদের অনেককে এখন দেখা না গেলেও নতুন কিছু মুখকে এ কাজে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

 

নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রশস্ত করার পরও যানজট কমেনি। বরং প্রশস্ত করা সড়কের জায়গা হকার, সিএনজি, লেগুনা ও অন্যান্য যানবাহনের দখলে চলে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে জানান সিলেটের সচেতন মহলের নাগরিকরা। তারা বলেন, বিশেষ করে কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় যানজট দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেখানে সিএনজি ও লেগুনার অস্থায়ী স্ট্যান্ড, হকারদের অবস্থান এবং যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর কারণে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। বিকেলের দিকে ফুটপাত দখল করে হকারদের বসার প্রবণতা আরও বাড়ে। নগরীর যানজট নিরসনে কোর্ট পয়েন্টসহ কয়েকটি এলাকায় রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। কোর্ট পয়েন্টের যানজট কমাতে সেখানে অস্থায়ী স্ট্যান্ডে সর্বোচ্চ ১০টি লেগুনা ও ২৫টি সিএনজি অটোরিকশা রাখার মৌখিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা সেই নির্দেশনা পুরোপুরি মানছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুরো এলাকা অনেকটা অস্থায়ী স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

 

নগরীর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ফের হকাররা ব্যবসা শুরু করেছেন—বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করছি। একই সঙ্গে মহানগরীর অলি-গলি ছেড়ে প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্যও বেড়েছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘নগরীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা খুব শিগগিরই বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে অভিযান শুরু করব। আশা করছি, এক-দুই দিনের মধ্যেই এ অভিযান শুরু করা সম্ভব হবে। নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সিটি কর্পোরেশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

 

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো অনুমোদন নেই। এসব যানবাহনের অধিকাংশ চালক প্রশিক্ষিত নন এবং তাদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কেও পর্যাপ্ত ধারণা নেই। হঠাৎ করে যেকোনো স্থানে বাঁক নেওয়ার কারণে প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে। যেহেতু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আইনগতভাবে বৈধ নয়, তাই মেট্রোপলিটন এলাকায় এসব যান চলাচল করতে পারবে না। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষা আমাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে। নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

 

উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি গণপরিবহন চালাতে বা চালানোর অনুমতি দিতে পারেন না। অথচ সিলেটে চলাচলরত অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কার্যকর কোনো নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে তিন দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে এখনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও নিয়মিত তদারকির অভাবে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

 

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৭