ছবি : সংগৃহীত
বাইরে রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড, ভেতরে টেবিল-চেয়ার ও খাবারের আয়োজন—দেখলে সাধারণ খাবারের দোকানই মনে হবে। তবে এর আড়ালে রয়েছে সারি সারি ছোট কেবিন। প্রতিটি কেবিনে রয়েছে আলাদা দরজা, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বর রোডের ৫ নম্বর এভিনিউয়ের ১৫ নম্বর সড়কের বাটারফ্লাই রেস্টুরেন্টে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে নানা বয়সি মানুষের আনাগোনা থাকলেও দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় রেস্টুরেন্টের চিত্র। একের পর এক তরুণ-তরুণী সেখানে প্রবেশ করে কেবিনে চলে যান। কেউ খাবার নিয়ে কেবিনে ঢোকেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। সন্ধ্যা যত বাড়ে, কেবিনগুলোতে ততই বাড়তে থাকে তরুণ-তরুণী ও যুগলদের আনাগোনা।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রেস্টুরেন্টটি পরিচালিত হচ্ছে। এসব তলায় রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য কেবিন। কেবিনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভেতরে অবস্থানকারীরা বাইরের লোকজনের দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারেন। দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থানের সুযোগ থাকায় এসব কেবিনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তারও ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রতিবেদকের ক্যামেরায় রেস্টুরেন্টের কেবিন ও এর আশপাশের বেশ কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। ভিডিও ধারণের সময় দেখা যায়, সাংবাদিকদের ক্যামেরা চোখে পড়তেই কয়েকজন যুগল কেবিন ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে সরে যান।
রেস্টুরেন্টের কর্মচারীরা সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণ বন্ধ করার পর তাদের আবার নিচে নামতে দেখা যায়। প্রতিবেদকের কাছে থাকা গোপন ভিডিওতেও এসব দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। কেবিনে প্রবেশ করা যুগলদের কেউ খাবার অর্ডার করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। আবার কেউ দীর্ঘ সময় পর কেবিন থেকে বের হয়ে রেস্টুরেন্ট ত্যাগ করেন। এমন দৃশ্য একাধিকবার দেখা গেছে। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও রেস্টুরেন্টটিতে আসতে দেখা যায়। ফলে এসব কেবিনে কারা আসছেন এবং কী উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কেবিনে বসার জন্য খাবারের বিলের বাইরে আলাদাভাবে টাকা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট এক কর্মচারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি কেবিনের জন্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়। বিশেষ সুবিধার কথা বলে খাবারের দামও বেশি রাখা হয় এবং অতিরিক্ত টিপস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো কেবিনের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকার চেয়েও বেশি নেওয়া হয়। টাকা পরিশোধের পর যুগলরা দীর্ঘ সময় কেবিনে অবস্থান করতে পারেন বলেও জানান ওই কর্মচারী।
রেস্টুরেন্টে আসা এক তরুণের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, শুধু খাবার খাওয়ার জন্যই অনেকে এখানে আসেন না। কেবিনের আলাদা ব্যবস্থা থাকায় অনেকের আগ্রহ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেবিনে যুগলদের আলাদা ব্যবস্থা দেওয়ার বিষয়ে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের একজনের সঙ্গে ফোনে কথা হয় প্রতিবেদকের। ওই কথোপকথনের কল রেকর্ডও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীকে বলতে শোনা যায়, আপাতত সব কেবিন রিজার্ভ রয়েছে। তবে কোনো একটি কেবিন খালি হলে সেখানে বসার সুযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ কেবিনের চাহিদা ও বুকিং থাকার বিষয়টিও ওই কথোপকথনে উঠে আসে।
এ সময় কেবিনের এই ব্যবস্থা নিয়ে ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টের কর্মচারীদের বিরূপ আচরণের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিও ধারণ করতে দেখে রেস্টুরেন্টের কয়েকজন কর্মচারী তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে রেস্টুরেন্টের গেট আটকে বাইরে থেকে আরও লোকজন ডেকে এনে সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়। পরে কৌশলে সাংবাদিকরা নিচে নেমে গেলে তাদের আবার রাস্তা থেকে জিম্মি করে রেস্টুরেন্টের ওপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন প্রতিবেদক। এ সময় ধারণ করা ভিডিও ডিলিট করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ভিডিও মুছে ফেলতে অস্বীকৃতি জানালে সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় রেস্টুরেন্ট এর উপরে আটকে রাখা হয়।
রেস্টুরেন্টের মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া আসিফ নামের এক ব্যক্তি এ সময় প্রতিবেদকের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও জানান প্রতিবেদক।
পরে সাংবাদিকরা নিচে নেমে এলে রেস্টুরেন্টের একজন ব্যক্তি তাদের উদ্দেশে বলেন, পুলিশ তাদের কিছুই করতে পারবে না এবং সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করা রয়েছে। একই সময় তিনি রেস্টুরেন্টে সাংবাদিকদের উপস্থিতির কারণে ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে প্রতিবেদকের সঙ্গে থাকা একজনের মোবাইল ফোন থেকে জোর করে ভিডিও ডিলিট করা হয় এবং তাকে রেস্টুরেন্টের ওপরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান প্রতিবেদক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মিরপুর এলাকায় অবৈধ রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের আড়ালে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মিরপুর-১-এর ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকা, মিরপুর-২-এর মসজিদ মার্কেটের পাশ এবং মিরপুর সাড়ে ১১ ও পূরবী সিনেমা হলের আশপাশে এমন একাধিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশাসন ও স্থানীয়রা অবগত থাকলেও নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ করতে চান না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব রেস্টুরেন্টে কেবিনকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার কারণে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা অবাধে অনৈতিক মেলামেশায় জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘটনার পর বিষয়টি মিরপুর বিভাগের ডিসিকে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মিরপুর মডেল থানার একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পাঠান। পরে লিখিত অভিযোগ নিয়ে মিরপুর মডেল থানায় গেলে অভিযোগ গ্রহণে পুলিশের পক্ষ থেকে গড়িমসির অভিযোগ ওঠে।
শুধু মিরপুরের বাটারফ্লাই রেস্টুরেন্টেই এমন কেবিন ব্যবসা চলছে, নাকি রাজধানীর অন্য রেস্টুরেন্টেও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সাংবাদিকদের আটকে রাখা, রেস্টুরেন্টের কর্মচারীদের হেনস্তা ও থানার সহযোগিতা না করার অভিযোগের বিষয়ে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক একজন এসআইকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। তিনি অভিযানে থাকায় রাতে ডিউটি শেষে ওই কর্মকর্তা তাকে বিষয়টি রিপোর্ট করেন। পরে সাংবাদিকদের থানায় অভিযোগ করতে বলা হলেও অভিযান শেষে ফিরে কাউকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেস্টুরেন্টের অবৈধ ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিষয়ে বিষয়টি তার জানা নেই জানিয়ে ওসি বলেন, এমন কার্যকলাপ হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইকে-০৪




