একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থা | জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রকে নির্ভর করতে হয় প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের ওপর। আধুনিক ও গতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো হিসাবের স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য প্রকাশ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশের সিংহভাগ ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তা (CMSME) এবং অনেক ব্যক্তি করদাতা এখনও প্রথাগত আনুমানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে হিসাব তৈরি করেন এবং আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। আয়কর আইন ২০২৩ এর কঠোর বিধান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ডিজিটালাইজেশনের অগ্রযাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায় যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ না করার এই প্রথাগত অভ্যাসটি বর্তমানে করদাতাদের জন্য এক বড় ধরনের অদৃশ্য আর্থিক, সামাজিক ও আইনি ঝুঁকি তৈরি করছে।
১. হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক নীতি ও কর আইনের মেলবন্ধন (Accounting Principles & Tax Law Synergies)
হিসাববিজ্ঞানকে বলা হয় ব্যবসায়ের ভাষা | হিসাববিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো 'দ্বৈত সত্তা' (Dual Aspect) এবং 'প্রমাণীকরণ নীতি' (Verifiability Principle) | এই নীতিগুলোর মূল কথা হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের পেছনে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ (যেমন : ডেবিট ভাউচার, ক্রেডিট ভাউচার, ক্যাশ মেমো, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইত্যাদি) থাকতে হবে।
আয়কর আইন ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী, একজন করদাতা যখন তাঁর রিটার্নে বা আর্থিক বিবরণীতে কোনো খরচ বা ব্যয় দেখাবেন, তার উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা তাঁর আইনি দায়িত্ব | যদি অডিট বা কর নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কোনো করদাতা তাঁর প্রদেয় ব্যয়ের সপক্ষে যুক্তিযুক্ত ভাউচার বা ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হন, তবে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তা আয়কর আইনের আওতায় সেই অসমর্থিত ব্যয়কে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য (Disallowed Expense) ঘোষণা করতে পারেন | এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ যে ব্যয়কে অগ্রহণযোগ্য ধরা হয়, তা করদাতার নিট আয়ের সাথে পুনরায় যোগ করা হয় | ফলে প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে লোকসানে থাকলেও কাগজে কলমে সেটি বিশাল মুনাফাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং করদাতাকে চড়া হারে অতিরিক্ত আয়কর পরিশোধ করতে হয় |
২. উৎসে কর (TDS) ও নগদ লেনদেনের জটিলতা (Tax Deductions at Source & Cash Transaction Hazards)
নতুন আয়কর আইনে উৎসে কর কর্তন (Tax Deducted at Source বা TDS) এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনের ওপর অভূতপূর্ব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে | বর্তমানে প্রবিধান অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ওপর যেকোনো ব্যবসায়িক কেনাকাটা, ভাড়া, বেতন কিংবা সরবরাহকারীর বিল পরিশোধ অবশ্যই ব্যাংকিং মাধ্যম (যেমন : অ্যাকাউন্ট পেয়ী চেক, ব্যাংক ট্রান্সফার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ইত্যাদি) দ্বারা সম্পাদন করতে হয়।
অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রথাগত অভ্যাসের কারণে কিংবা ব্যাংকিং ঝামেলা এড়াতে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন বা ক্যাশ ট্রানজেকশন করে থাকেন। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত নগদ লেনদেনকে সরাসরি আইনি খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হয় | অর্থাৎ, আপনি যদি পণ্য ক্রয়ের বিপরীতে নগদ অর্থ পরিশোধ করেন এবং তার পক্ষে ব্যাংকিং প্রমাণ না থাকে, তবে সেই ক্রয়মূল্যকে ব্যয়ের খাত থেকে কেটে দেওয়া হবে | এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কোম্পানির করযোগ্য আয়ের ওপর | এর ফলে কেবল সঠিক উপায়ে খাতা ও ভাউচার না রাখার কারণে একটি সচল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান রাতারাতি বিপুল পরিমাণ করদাবি, বিলম্ব সুদ ও জরিমানা বা পেনাল্টির মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
৩. কর অডিট ও অদৃশ্য আর্থিক ঝুঁকি (Tax Audit Exposure & Hidden Financial Risks)
সাধারণ করদাতাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, কোনো মতে রিটার্ন জমা দিয়ে প্রসেসিং স্লিপ বা একনলেজমেন্ট পেপার হাতে পেলেই কর সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল | কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন | আয়কর আইনের আওতায় যেকোনো রিটার্ন পরবর্তী যেকোনো সময় কর অডিটের (Tax Audit) জন্য নির্বাচিত হতে পারে।
অডিটের মুখোমুখি হওয়ার পর যখন কর কর্মকর্তার দপ্তর থেকে বিগত কয়েক বছরের খাতাপত্র, ব্যাংক হিসাব এবং ভাউচার উপস্থাপন করতে বলা হয়, তখনই তৈরি হয় আসল সংকট | যেসব করদাতা বছরের পর বছর প্রফেশনাল হিসাবরক্ষক না রেখে আনুমানিক হিসাবের ওপর ভর করে রিটার্ন দিয়েছেন, তারা তখন প্রয়োজনীয় ফাইল ও ক্যাশ বুক দেখাতে পারেন না | এর ফলে কেবল অতিরিক্ত করদাবিই তৈরি হয় না, বরং আয় গোপন করার অপরাধে বা মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগে জরিমানা এবং আইনি নোটিশের মুখোমুখি হতে হয় | যে অর্থ তারা বছরের পর বছর হিসাবরক্ষণ না করে বা আইটিপি (ITP)/কর আইনজীবীর ফি বাঁচিয়ে সঞ্চয় করেছিলেন বলে ভেবেছিলেন, অডিটের টেবিলে এসে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ জরিমানা হিসেবে গলে যায়।
৪. প্রফেশনাল পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা ও মানসিকতার পরিবর্তন (Need for Professional Consultancy & Shift in Mindset)
আমাদের দেশের অনেক ব্যবসায়ী ও করদাতা মনে করেন নিয়মিত হিসাবরক্ষণ করা, প্রফেশনাল বুক কিপার নিয়োগ দেওয়া কিংবা একজন আয়কর আইনজীবীর (Tax Consultant) পরামর্শ নেওয়া একটি অনাবশ্যক বাড়তি খরচ | এই মানসিকতাই হলো উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় |
একজন দক্ষ আয়কর আইনজীবী বা হিসাব বিশেষজ্ঞ কেবল কর নির্ধারণেই সাহায্য করেন না বরং তিনি বছরের শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে কর আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে পরামর্শ দেন (Tax Planning) | তিনি নিশ্চিত করেন যেন উৎসে কর সঠিকভাবে কাটা হয় এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা হয় | এতে করে বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অপ্রত্যাশিত ট্যাক্স লায়াবিলিটি বা আইনি নোটিশের সম্মুখীন হয় না | সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা কোনো বাড়তি ব্যয় নয়, বরং এটি ব্যবসার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষামূলক বিনিয়োগ।
৫. একটি আধুনিক ও কর বান্ধব বাংলাদেশের প্রত্যাশা (Visioning a Modern & Tax Compliant Bangladesh)
ডিজিটাল প্রযুক্তির ধারাবাহিকতায় এখন স্মার্ট ট্যাক্স ম্যানেজমেন্টের যুগে আমরা প্রবেশ করেছি | অনলাইন ই রিটার্ন, ই টিডিএস এবং ডিজিটাল ডেটা ট্র্যাকিংয়ের ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখন সহজেই একজন নাগরিকের ব্যাংক হিসাব, জমি বা সম্পদ ক্রয় বিক্রয় এবং বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারে | এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশনের যুগে আনুমানিক বা অসচ্ছ হিসাব দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
শিক্ষক ও আয়কর আইনের শিক্ষাগ্রহীতা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করা।
প্রাতিষ্ঠানিক হিসাববিজ্ঞান শিক্ষার সাথে বাস্তব জীবনের কর পদ্ধতির সমন্বয় ঘটাতে হবে | সরকারকেও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হিসাব সংরক্ষণের নিয়মাবলী আরও সহজ ও শিক্ষণীয় করে তুলতে হবে।
আয়কর প্রদান কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা বা রাষ্ট্রীয় চাপ নয় এটি একজন সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব | তবে সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম ধাপই হলো সৎ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ করা | প্রথাগত ও অনুমাননির্ভর হিসাবের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক বইপত্র, ভাউচার ও ব্যাংকিং লেনদেন মেনে চলাই পারে একজন করদাতাকে অহেতুক আইনি জটিলতা, মানসিক চাপ এবং আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।
স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণই হোক আধুনিক কর ব্যবস্থার চালিকাশক্তি।
লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমকম (হিসাব বিজ্ঞান) , এম পিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য)। শিক্ষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ ও আয়কর আইনজীবী নিবন্ধন পরীক্ষার্থী।




