যুক্তরাষ্ট্রে জালিয়াতির অভিযোগে জাকিয়া খান (৫৫) নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক নারীকে সাড়ে ৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নিউইয়র্কের আদালত। ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বয়স্কদের সেবা কেন্দ্র (অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার) পরিচালনার আড়ালে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা) প্রতারণা করেছেন তিনি।
.gif)
একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার ফেরত দেওয়া এবং অবৈধভাবে অর্জিত ৫০ লাখ ডলার সমমূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে মেডিকেইডের সেবাগ্রহীতা সেজে আসা এক ছদ্মবেশী গোয়েন্দা কর্মকর্তার হাতে অবৈধ ঘুষের অর্থ তুলে দেওয়ার সময় গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়েন জাকিয়া খান। সে সময় তাকে অত্যন্ত উৎফুল্ল মেজাজে টেবিলের ওপর নগদ ডলারের বান্ডিল সাজিয়ে গুনতে দেখা যায়।
খবরে বলা হয়, গোপন ক্যামেরায় তোলা ভিডিওতে ঘুষের নগদ অর্থ গুনতে দেখা যাওয়া এই নারী ব্রুকলিনের কোনি আইল্যান্ড এলাকায় ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’ এবং ‘ফ্যামিলি সোশ্যাল’ নামে দুটি ডে কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করতেন।
জাকিয়া খান দুই প্রতিষ্ঠান মিলে মেডিকেইডের কাছে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ভুয়া বিল জমা দিয়েছিল, যার মধ্যে কর্তৃপক্ষ ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করে।
আদালতের নথি বলছে, জাকিয়া খান ব্রুকলিনের কনি আইল্যান্ড এলাকায় দুটি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার সেন্টারের মালিক ছিলেন। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো- হ্যাপি ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনকরপোরেটেড (হ্যাপি ফ্যামিলি) এবং ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনকরপোরেটেড (ফ্যামিলি সোশ্যাল)।
এছাড়া তিনি রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং ইনকরপোরেটেড নামে একটি হোম হেলথ কেয়ার ফিসকাল ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। জালিয়াতির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ গ্রহণ ও তার প্রকৃত উৎস গোপন করতে তিনি তানউই সার্ভিসেস ইনকরপোরেটেড নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতেন।
ব্রুকলিন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত অবৈধ সুবিধা ও ঘুষের বিনিময়ে একদল মার্কেটার মেডিকেইডের সুবিধাভোগীদের জাকিয়া খানের পরিচালিত সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতে নিয়ে আসতেন।
খান ও ওই মার্কেটাররা মেডিকেইডের সেসব সুবিধাভোগীদের ঘুষ ও কিকব্যাকের বিনিময়ে মেডিকেইডের কাছে বিল করতেন। কিন্তু মেডিকেইডের কাছে যেভাবে এসব সেবা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে সেভাবে কোনো সেবা দেওয়া হয়নি।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হ্যাপি ফ্যামিলি ও ফ্যামিলি সোশ্যাল মিলে মেডিকেইডের কাছে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জালিয়াতিপূর্ণ বিল জমা দেয়। এসব মিথ্যা ও জালিয়াতিপূর্ণ দাবির ভিত্তিতে মেডিকেইড প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করে।
পরবর্তীতে গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে খান স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ষড়যন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতারণা ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
গত বুধবার ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ নাতাশা মার্লে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারক জাকিয়া খানকে ৭৬ মাস বা সাড়ে ছয় বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এর আগে গত বছরের আগস্টে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতি এবং সরকারের সঙ্গে প্রতারণার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেছিলেন জাকিয়া।
কারাদণ্ডের পাশাপাশি জাকিয়া খানের ব্রুকলিনের বাসা থেকে জব্দ করা নগদ অর্থ, বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না এবং দুটি বাড়িসহ মোট ৫০ লাখ ডলারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে মেডিকেইডের ক্ষতিপূরণ বাবদ তাকে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে। নিউ ইয়র্কের মেডিকেইড হোম কেয়ার প্রোগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলা তদারকির অভাব ও দুর্নীতি বন্ধে এ রায়কে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি নোসেলা বলেন, ‘আজকের এই সাজা আমাদের ডিস্ট্রিক্টে অপরাধ দমনে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। আমেরিকান করদাতাদের প্রতারণার হাত থেকে সুরক্ষা দিতে আমাদের কার্যালয় ও বিচার বিভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণে আমাদের ডিস্ট্রিক্টে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে মামলা পরিচালনা করব।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০২




