সবুজ চা-পাতা আর কালচে তামাটে হাত। দুইয়ের অটুট সম্পর্কে গড়ে উঠেছে চা-শিল্প। তামাটে হাতের তোলা ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ কারখানার ঘূর্ণায়মান যন্ত্রে রূপান্তরিত হয় শিল্পে। শ্রমিকদের ঘামঝরা শ্রমে তৃপ্তির ধোঁয়া ওঠে চায়ের কাপে। অথচ এ তৃপ্তির কারিগররা আজও রয়ে গেছেন অধিকারবঞ্চিত। মজুরির নামে বঞ্চনা, আবাসনের নামে ভাঙা বেড়ার ঘর আর স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় এখনো সুবিধাবঞ্চিত চা-শ্রমিকরা।


প্রায় পৌনে দুই শ বছর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বাগানে কাজ করলেও এখনো তাঁদের মেলেনি ভূমির মালিকানার অধিকার। এ যেন আধুনিক যুগের ‘ক্রীতদাস’-এর গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে চা-শ্রমিকদের জীবন। উদ্বাস্তু জীবনের কারণে চাকরি কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেতে তাঁদের পোহাতে হয় অভাবনীয় ভোগান্তি। আর দৈনিক মজুরি ১৮৭ বা মাসে ৩ হাজার ৬১০ টাকা মনে করিয়ে দেয় তাঁরা বাস করছেন ‘ভিনগ্রহে’।  সিলেট বিভাগে এমন বঞ্চনার শিকার প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার চা শ্রমিক। 



নতুন পে-স্কেলে যেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে ১০০-১৪২ শতাংশ, সেখানে চা-শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ৫ শতাংশ। সে দাবি প্রত্যাখান করে ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা নেমেছেন আন্দোলনে।

বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিক চা-বাগান সিলেটের মালনীছড়া। ১৮৫৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও বাগানটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪৩ সালে। ‘ভালো কাজ’-এর লোভ দেখিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ ও অন্ধপ্রদেশের মতো অভাবগ্রস্ত অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের সিলেটে ধরে নিয়ে আসে। সিলেটে এনে তাঁদের জোর করে চা-বাগানের কাজে লাগায়। দীর্ঘ এ পথচলায় বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও পৌনে দুই শ বছরে তাঁদের কপালে বঞ্চনা ছাড়া কিছুই জোটেনি।


জানা গেছে, সিলেট বিভাগে চা বাগান আছে ২০৫টি। আর তাতে কাজ করেন স্থায়ী শ্রমিক ৮৭ হাজার, অস্থায়ী ৩৫ হাজার। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে সিলেট বিভাগে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ২২ হাজার। মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিক সুভাষিণী বাড়াইক। বয়সের কোটা নব্বইয়ের ঘরে। পূর্বপুরুষরা ভারত থেকে এসেছিলেন। তাঁদের ঠকিয়েছিল ব্রিটিশরা। সেই ঠকে যাওয়া জীবনের পরম্পরা বয়ে বেড়াচ্ছেন সুভাষিণী। আক্ষেপ করে বলেন, ‘কত প্রজন্ম মিশেছে এ মাটিতে। কিন্তু এ মাটির মানুষ (মালিকানা) হতে পারলাম না!’

শ্রমিকনেতা রাজু গোয়ালা বলেন, ‘থাকার জন্য প্রত্যেক স্থায়ী শ্রমিক পরিবারকে ১৬০ বর্গফুটের একটি ঘর দেয় বাগান কর্তৃপক্ষ। বাঁশবেতের কাঁচা ঘর। পরিবারে সদস্যসংখ্যা বাড়লে ঘরের সংখ্যা বাড়ার সুযোগ নেই। বাগান কর্তৃপক্ষকে “ম্যানেজ” করে ঘরের সঙ্গে একচালা ছাউনি দিয়ে বাড়াতে হয় পরিধি। সব বাগানে এ সুযোগও মেলে না। আর কোনো শ্রমিকের সামর্থ্য থাকলে ভাঙা বেড়ার ঘরের পরিবর্তে পাকা ঘর করেন।’ 


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দৈনিক ন্যূনতম ২০ থেকে ২৪ কেজি চা-পাতা উত্তোলনের পারিশ্রমিক হিসেবে শ্রমিকরা মজুরি পান ১৮৭ টাকা। সপ্তাহে রেশন পান ৩ কেজি ৪০০ গ্রাম আটা বা চাল। তবে অস্থায়ী    শ্রমিকরা মজুরি পেলেও বঞ্চিত হন রেশন থেকে। রাজু গোয়ালা জানান, বাগানগুলোতে  প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা থাকলেও কোনো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে বাইরের কোনো হাসপাতালে গেলে সহায়তা মেলে না। আর শিক্ষার ক্ষেত্রে সুযোগের অভাবে অর্ধেক শিশুই ঝরে পড়ে প্রাথমিক পর্যায়ে।

তবে শ্রমিকদের ভূমির মালিকানার দাবিটি বাগান মালিকদের হাতে নেই বলে দাবি করেছেন কালাগুল, ছড়াগাঙ ও বুরজান চা-বাগানের স্বত্বাধিকারী এনায়েত আহমদ মণি। তিনি বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।’ মজুরি প্রসঙ্গে বলেন, ‘চলমান মজুরি দিয়েও বাগান চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের দাবীকৃত ৫০০ টাকা মজুরি প্রদান অকল্পনীয়!’


সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ