ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানীর মিরপুরের নিউগিনি প্রোপার্টিজের ভবনে শনিবার (২৬ মার্চ) রাতের এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন আবাসন ব্যবসায়ী মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু।
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ব্যক্তি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সখ্য রেখে গত কয়েক বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখল, অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা এবং একাধিক মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়ে সালমান মুক্তাদির স্টুডিও করেছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। শনিবার রাতে ওই স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার মূল লক্ষ্য সালমানের স্টুডিও ছিল—এমনটা নয়; জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিমুদ্দিন সম্প্রতি ওই এলাকায় তিনটি নতুন গেট নির্মাণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, গেটগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে ভেতরের অন্য জমির মালিকরা তাদের জায়গায় যেতে না পারেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা লোকজন ভাড়া করে গেট ভাঙতে যান। তবে নাজিমুদ্দিনের সম্পদ মনে করে ওই সময় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে উঠে এসেছে।
নাজিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে। ২০১০ সালের দিকে তিনি ঢাকায় আসেন। রামপুরার একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং ওই সময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তার বেশভূষা দেখলে যে কেউ মনে করবে মস্ত বড় আলেম। স্থানীয়দের কাছে নিজেকে পরিচয়ও দেন মাওলানা হিসেবে। সবসময় থাকেন ধর্মীয় লেবাসে। জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও করেন কখনো-সখনো। তবে বাস্তবজীবনে ঠিক উল্টো। দুই ডজন মামলার আসামি কথিত এই মাওলানা।
অন্যের জমি দখল ও ব্যবসা করে মাত্র পাঁচ বছরেই বনে গেছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। দখলে সিদ্ধহস্ত এই কথিত মাওলানার নাম মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজু।
রাজধানীতে আসার পর শুরুতে ভাসানটেক এলাকায় ভাঙাড়ি ও থাই গ্লাসের ব্যবসা করেন। ভাঙাড়ির ব্যবসা করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর আবাসন ব্যবসায় নামেন নাজিমুদ্দিন। প্রতিষ্ঠা করেন নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড।
পরে স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ক্যান্টনমেন্ট থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি আব্বাসের ছত্রছায়ায় জমি দখলের কার্যক্রম শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে এলাকায় তিনি বড় আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পান। তবে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার স্থানীয়দের অনেকের কাছে তিনি ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে পরিচিত বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
স্থানীয়দের দাবি, একপর্যায়ে নাজিমুদ্দিন নিজেকে গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। তবে তিনি ওই ইউনিটের কমিটিতে নেই এবং তাকে তারা চেনেন না—এমন দাবি করে ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সাহিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আরিদুল ইসলাম যৌথভাবে ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
জোয়ারসাহারায় জমি দখলের অভিযোগ
জোয়ারসাহারা মৌজায় নাজিমুদ্দিন প্রায় ১৪ বিঘা জমি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার দখলের কারণে দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন অনেক জমির মালিক। কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার জমিও জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের জমিতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা।
নাজিমুদ্দিনের দখলে থাকা জমির তালিকায় বোরহান উদ্দিনের বসতবাড়ির ৩ দশমিক ৩৭ কাঠা, শরফত মোল্লার ৩১ দশমিক ৮২ কাঠা, মইদুর আলীর ওয়ারিশ মোছা. হালিমা খাতুনের ৩ কাঠা, ইকবাল হোসেন গংদের আমমোক্তারনামা মালিক মো. আক্তারুজ্জামানের ১৫ দশমিক ৭৬ কাঠা, শামিমা ইসলাম গংয়ের ১৪ দশমিক ০৬ কাঠা এবং সাজেদুর রহমানের ৩ কাঠা জমি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া সাকুরা সাবেরের আমমোক্তারনামা মালিক মো. আক্তারুজ্জামানের ৩ দশমিক ৫০ কাঠা, মো. মোশারফ হোসেন, মো. ফখরুল ইসলাম ও মোছা. শিউলি আক্তারের ৬ কাঠা, সৈয়দ মাহবুবুল গনির আমমোক্তারনামা মালিক মো. মোখলেছুর রহমানের ৭ দশমিক ৮৭ কাঠা, মো. হারুন রশীদ গংদের ৯ দশমিক ১৫ কাঠা, মোছা. মোখলেছুর রহমানের অন্য একটি দাগের ১৩০ দশমিক ৮৫ কাঠা এবং খান মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের ২২ দশমিক ১৮ কাঠা জমিও তার দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ
নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ক্যান্টনমেন্ট থানার জোয়ারসাহারা মৌজার মানিকদী এলাকায় ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের পর রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযান চালিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সময় নাজিমুদ্দিন ও তার লোকজন রাজউকের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর রাজউকের ইমারত পরিদর্শক শেখ আতিফ হোসেন ইমন ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাও করেছেন।
পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক
একসময় ভাঙাড়ির ব্যবসা করা নাজিমুদ্দিন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে আসে। রাজধানীর জোয়ারসাহারা মৌজায় সিএস ও এসএ ৬১০, ৬১১, ৬১২, ৬১৩, ৬১৪, ৬১৫, ৬১৬ ও ২৬৫ দাগে প্রায় ১৭ বিঘা জমি রয়েছে বলে জানা যায়। ওই জমির তৎকালীন বাজারমূল্য প্রায় শতকোটির কাছাকাছি।
এ ছাড়া বাউনিয়া মৌজায় সিএস ও এসএ ২৫৭ দাগে প্রায় ১০ বিঘা জমির মালিকানার তথ্য পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। মিরপুর ডিওএইচএসে প্রায় ৪ হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ডিওএইচএস রোডে সিটি কাবাবের ৫ কাঠা জমি, লাল মিয়ার টেক-মানিকদীতে ৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বহুতল ভবন এবং বসুন্ধরার এ, বি ও এন ব্লকে তিনটি প্লট ও একটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও উঠে আসে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নাজিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে প্রায় ৮০ বিঘা জমি রয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে একটি স্বর্ণের দোকান এবং মালয়েশিয়ায় দুটি দোকান ও একটি তেলের পাম্পে বিনিয়োগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য কয়েক’শ কোটি টাকা।
নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুই ডজনের মতো মামলা থাকার কথাও অনুসন্ধানে উঠে আসে। এসব মামলার মধ্যে জমি দখল, হামলা ও অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে বলে জানা যায়। গ্রেপ্তার হয়ে পরে জামিনে বেরিয়ে আসার ঘটনাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে ভাঙাড়ির ব্যবসা থেকে আবাসন ব্যবসায় এসে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নাজিমুদ্দিনকে ঘিরে জমি দখল, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া সে সময় বলেছিলেন, ‘এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কারও জমি দখল করিনি। জমি দখলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
ম্যাজিস্ট্রেটকে মারধরের বিষয়ে বলেন, রাজউকের অভিযানের সময় ৪০-৫০ জনের বাহিনী নিয়ে তারা অভিযান চালিয়েছে, তাদের আমরা মারধর করেছি—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য।
জমিজমার বিষয়ে বলেন, আমার শুধু ৩ কাঠা জমিতে একটি টিনশেড বাড়ি আছে। এ ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। আমি যাত্রাবাড়ী, রামপুরা মাদ্রাসায় পড়েছি। এরপর হক-হালালিভাবে ব্যবসা করছি।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৪
সূত্র : কালবেলা






