সিলেটে দেবোত্তর সম্পত্তির উপর গড়ে ওঠা তারাপুর চা বাগানটির আয়তন ছিল প্রায় ৫০০ একর। বিশাল চা বাগানের চারপাশে ছিল টিলা ও সমতলের মিশেলে বিস্তৃর্ণ খালি জায়গা। ভূমিখেকোদের থাবায় সেই সম্পত্তির ৭০ ভাগই বেদখল হয়ে গেছে। খালি জায়গায় গড়ে ওঠেছে বাসা-বাড়ি, দোকানপাঠ, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বাগানের বর্তমান ব্যবস্থাপকের তথ্যমতে, দেবোত্তর সম্পত্তিটির প্রায় ৩০০ একর জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। খালি জায়গা দখলের পর এবার বাগানের দিকে চোখ পড়েছে ভূমিখেকোদের। বাগান ধ্বংস করে অবশিষ্ট ভূমি দখলে চলছে নানা তৎপরতা। অভিযোগ রয়েছে, যারা যখনই বাগানটির রক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন তারাই অবর্তীণ হয়েছেন ভক্ষকের ভূমিকায়। দখল প্রক্রিয়া এখনও চলমান আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯১৫ সালের ২ জুলাই তৎকালীন মালিক বৈকুন্ঠচন্দ্র গুপ্ত তারাপুর চা বাগানসহ ১৩৮ হাল ১ কেদার ৩ পোয়া (প্রায় ৫০০ একর) ভূমি শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ জিউ দেবতার নামে উৎসর্গ করেন। ওই দানপত্র মূলে চারপাশের ভূমিসহ বাগানটি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। বৈকুন্ঠচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রাজেন্দ্র গুপ্ত ওই সম্পত্তির সেবায়েতের দায়িত্ব পান। রাজেন্দ্রের পর তাঁর ছেলে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত সেবায়েত নিযুক্ত হন।
১৯৮৮ সালে ওই বাগানের নিয়ন্ত্রণ নেন শিল্পপতি রাগীব আলী। ২০০৯ সালে পঙ্কজ গুপ্ত দেবোত্তর সম্পত্তি ফিরে পেতে আদালতে মামলা (নং ১৬৩/০৯) করেন। ২০১৬ সালে ওই মামলার রায়ে রাগীব আলীকে অপসারণ করে পঙ্কজকে দেবোত্তর সম্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দায়েরকৃত তিনটি রিভিউ হয়।
২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি তিনটি রিভিউ একত্রিত করে আপিল বিভাগ কিছু সংশোধনীসহ আগের রায়ই বহাল রাখেন। সেই সাথে পঙ্কজ গুপ্তকে অব্যাহতি দিয়ে তার ছেলে প্রসেনজিৎ সেন গুপ্তকে পরিচালনা কমিটির আজীবন সদস্য মনোনীত করেন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনা মতে, ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১১ সদস্যের একটি কমিটিকে বাগান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়।
২০১৬ সালে আদালতের রায়ের পর ৭১৫টি অবৈধ স্থাপনা ও বেদখলীয় ভূমিসহ চা বাগানের ৩২৩.০৮ একর ভূমি কাগজে কলমে সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ওই স্থাপনার তালিকায় বাসা-বাড়ি, দোকানপাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরণের ভবন ছিল। পরবর্তীতে বর্তমান পরিচালনা কমিটিও একইভাবে বেদখলকৃত ভূমিসহ বাগান বুঝে নেয়।
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে যারাই বাগানের দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবাই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বাগানের ভূমি বিক্রি করেছেন। কেউ জাল দলিলে বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার নামে বাগানের জমি বেহাত করেছেন। সবচেয়ে বেশি ভূমি বেহাত হয়েছে রাগীব আলী দায়িত্বকালীন সময়ে। ওই সময় তিনি নিজে বাগানের জায়গায় হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, ছাত্রাবাস ও স্কুলসহ বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণ করেন। রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি বাগানের জায়গায় আবাসন প্রকল্প গড়েছেন।
পঙ্কজ কুমার গুপ্ত সেবায়েত থাকাবস্থায়ও বাগানের বিপুল পরিমাণ জায়গা হাতছাড়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে জায়গা লিখে দিয়েছেন। তার দেওয়া লিখিত স্ট্যাম্প নকল করে এখনো জায়গা দখল চলছে। পঙ্কজ কুমার গুপ্ত বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাগানের বর্তমান ব্যবস্থাপক ও মূখ্য সমন্বয়ক রিংকু চক্রবর্তীর বিরুদ্ধেও জায়গা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পঙ্কজ গুপ্তের দেওয়া ইজারার দলিল কপি করে তিনি জায়গা বিক্রি করছেন। তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রিংকু চক্রবর্তী। একটি মহল বাগানের জায়গা দখল করতে না পেরে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি রিংকুর।
রিংকু চক্রবর্তী জানান, বেদখলীয় ভূমি ও অবৈধ স্থাপনাসহ প্রশাসন ৩২৩.০৮ একর ভূমি বুঝিয়ে দিয়েছিল। ওই সময় ১২৫-১৩০ একর বাগান ছাড়া বাকি সকল ভূমি বেদখল ছিল। বেদখলকৃত ভূমিতে এক হাজারের মতো স্থাপনা রয়েছে। ভূমি দখলের ঘটনায় আদালতে ৪১টি মামলা ও থানায় শতাধিক জিডি রয়েছে। এখন ভূমিখেকোরা চা বাগান ধ্বংস করে জায়গা দখলের চেষ্টা করছে। চা গাছ পুড়িয়ে দিয়ে ভূমি দখলের চেষ্টাও হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষ ভূমি রক্ষার সর্বোতচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাগান কর্তৃক নিয়োজিত আইনজীবী সামসুজ্জামান জামান বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি জাল কাগজপত্র তৈরি করে বাগানের ভূমি দখল করেছেন। এই তালিকায় প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার নামও রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্লট উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলোও উদ্ধারের প্রক্রিয়াধীন আছে। বেশ কয়েকটি জাল দলিলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান আছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ





