অবসর ও কল্যাণ তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সহজ শর্তে ঋণসুবিধা চালু করা সময়ের দাবি
একজন মানুষ তাঁর সারা জীবনের উপার্জন থেকে কিছু অর্থ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করেন। ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে তিনি জমার হিসাব জানতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্তে সেই আমানতের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগও থাকে। কিন্তু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অবসর ও কল্যাণ তহবিলে নিয়মিত অর্থ জমা দেওয়ার পরও ব্যক্তিগত জমার হিসাব জানা এবং আর্থিক সংকটে সেই অর্থের বিপরীতে ঋণসুবিধা পাওয়ার বিষয়টি আজও গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে অর্থ কর্তন করা হলে সেই অর্থের হিসাব তাঁদের কাছে সহজলভ্য হবে না কেন?
বেতন থেকে কর্তন, অথচ হিসাব জানার নিশ্চয়তা কোথায়?
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের জন্য নির্ধারিত হারে অর্থ কর্তন করা হয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় এ দুই খাতে মোট ১০ শতাংশ অর্থ কর্তনের বিষয়টি শিক্ষকসমাজের কাছে সুপরিচিত। কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন থেকে অবসর সুবিধার জন্য কত টাকা এবং কল্যাণ তহবিলের জন্য কত টাকা কর্তন করা হচ্ছে, তার পৃথক ও সহজে যাচাইযোগ্য হিসাব বেতন বিবরণীতে দৃশ্যমান থাকা অত্যন্ত জরুরি।
একজন শিক্ষক চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত অর্থ জমা দেন। অথচ নিজের নামে মোট কত টাকা জমা হয়েছে, কত টাকা কর্তন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট তহবিলের বিধি অনুযায়ী তিনি কী পরিমাণ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী—এসব তথ্য জানার জন্য তাঁকে যেন জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে না হয়।
স্বচ্ছতা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সুশাসন ও জবাবদিহির অপরিহার্য অংশ। শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্থের ব্যবস্থাপনায়ও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।
আর্থিক সংকটে শিক্ষকের পাশে থাকবে কে?
একজন শিক্ষকও সমাজের আর দশজন মানুষের মতোই নানা আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন। হঠাৎ অসুস্থতা, সন্তানের শিক্ষাব্যয়, পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন কিংবা বাড়ি নির্মাণের মতো কাজে তাঁর অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এমন সময় ব্যাংকঋণ গ্রহণ করতে গেলে নানা শর্ত, সুদের হার ও কিস্তির চাপ সামলাতে হয়।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে বেতন থেকে অর্থ জমা দেওয়া একজন শিক্ষক যদি নিজের জমাকৃত অর্থের বিপরীতে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে যায়।
অবশ্য অবসর ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের মতো নয়; এ অর্থের সঙ্গে নির্দিষ্ট বিধিবিধান, ভবিষ্যৎ দায়বদ্ধতা এবং তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা জড়িত। তাই ঋণসুবিধা চালুর ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে এসব সীমাবদ্ধতাকে সামনে রেখে বিষয়টি বিবেচনার বাইরে না রেখে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ব্যক্তিগত হিসাব দেখার ব্যবস্থা চালু করা হলে প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারী নিজেই তাঁর কর্তনের তথ্য যাচাই করতে পারবেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মোট জমা, প্রাপ্য সুবিধা এবং আবেদন নিষ্পত্তির অগ্রগতিও জানা সম্ভব হবে।
এ উদ্যোগের ফলে হিসাবের স্বচ্ছতা বাড়বে, ভুলত্রুটি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঁচটি প্রস্তাব:
শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো বিবেচনার দাবি রাখে—
১. মাসিক সেলারি শিটে অবসর ও কল্যাণ তহবিলের জন্য পৃথক দুটি কলাম সংযুক্ত করা।
২. প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যক্তিগত জমা ও কর্তনের হালনাগাদ হিসাব অনলাইনে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করা।
৩. তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা ও আইনগত বিধিবিধান পর্যালোচনা করে জমাকৃত অর্থের বিপরীতে সহজ শর্তে স্বল্পসুদে বা সুদবিহীন ঋণসুবিধা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করা।
৪. তহবিলের আয়-ব্যয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
৫. অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আবেদন নিষ্পত্তিতে অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা।
শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক
শিক্ষক সমাজের মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু যাঁরা অন্যের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজেদের জীবন ব্যয় করেন, তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি অবহেলিত থাকা কাম্য নয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিল তাঁদের চাকরিজীবনের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই তহবিলের ব্যবস্থাপনা হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শিক্ষকবান্ধব।
আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি জানাই—অবসর ও কল্যাণ তহবিলের হিসাব সেলারি শিটে দৃশ্যমান করুন, ব্যক্তিগত হিসাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করুন এবং সহজ শর্তে ঋণসুবিধা প্রদানের বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিন।
শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ কর্তন করা হলে সেই অর্থের হিসাব জানার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি একটি ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক(ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।





