কাউন্সিলরবিহীন সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এতে নাগরিক সেবা পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। জনপ্রতিনিধি না থাকায় ওয়ার্ডগুলোর সার্বিক বিষয় দেখতে হচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজ দাপ্তরিক কাজ সামলানোর পাশাপাশি এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে নগরীর সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ওপর। সময়মতো সনদপত্র, সনদ সংশোধনসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।


প্রয়োজনীয় সনদ পেতে বারবার ওয়ার্ড কার্যালয়ে ছুটতে হচ্ছে। কখনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও আবার অনলাইন সেবা পুরোপুরি চালু না থাকায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সিসিক নাগরিকরা। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ সনদ ও নাগরিকত্বের প্রত্যয়নপত্র নিতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন অনেকে।



শুধু সনদ নয়। হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, জন্মনিবন্ধন সংশোধন এবং বিভিন্ন নাগরিক অভিযোগের ক্ষেত্রেও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। সড়ক সংস্কার, ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য অপসারণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো ওয়ার্ডভিত্তিক সেবায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিসিকের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয়। এরপর প্রশাসকের অধীনে চলছে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। পরবর্তী সময়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ১৪ জন কর্মকর্তাকে সিসিকের ৪২টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে নিজ নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করায় নাগরিক সেবার গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে|


নগরবাসীর অভিযোগ, একটি প্রয়োজনীয় সনদ পেতেও একাধিকবার ওয়ার্ড কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। কখনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না পেয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। আবার কোথাও অনলাইন সেবা পুরোপুরি চালু না থাকায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন করতে হচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াতের খরচ। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টাও।


নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মতিন বলেন, ‘কোনো সমস্যা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে গেলে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় কার্যালয়ে গিয়েও তাঁদের পাওয়া যায় না।


একই ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। সাড়া পাইনি। পরে কার্যালয়ে গিয়েও তাঁর দেখা মেলেনি।’


১৪ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দার অভিযোগ, একটি সনদ সংগ্রহ করতেই একাধিক জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফয়সল বলেন, ‘কার কাছে যাব, গিয়ে তো কাউকে পাই না। ৫ আগস্টের পর এমনকি কাউন্সিলরদের অপসারণের প্রয়োজন ছিল কি না, সেটিও প্রশ্ন।’


তবে জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক কাউন্সিলররা। সিসিকের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবিএম জিল্লুর রহমান উজ্জ্বল বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি না থাকলে সাধারণ মানুষের সরাসরি সমস্যা বোঝা কঠিন। প্রতিদিন মানুষ নানা অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে আসছেন।’


তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানে নির্বাচিত কাউন্সিলরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। একজন জনপ্রতিনিধি থাকলে কার্যক্রমটি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো।’


উজ্জ্বল বলেন, ‘সাধারণ মানুষের পক্ষে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের কাছে সহজে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ওয়ার্ড পর্যায়ে একজন জনপ্রতিনিধি থাকা জরুরি।’নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ৪২টি ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলরদের পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ওয়ার্ড পর্যায়ে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হতো।


ভবিষ্যতে কাউন্সিলরদের জন্য ‘ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স’ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।


অন্যদিকে, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মুনিম বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ছাড়া জনগণকে নিবিড়ভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।’


সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের ধরণ আলাদা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলররা নিয়মিত কার্যালয়ে বসে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন। কোথাও কোথাও বর্তমানে সেবা নিতে অতিরিক্ত কাগজপত্র, এমনকি এফিডেভিটও চাওয়া হচ্ছে।’

 

তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা|

নগরবাসীর অভিযোগের বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন সিলেট জাতীয় গৃহায়ন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদার। তিনি সিসিকের ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নাগরিক সেবায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে নেজামুল হক মজুমদার বলেন, ‘আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডগুলোতে আমি কোনো গাফিলতি করিনি। তবে আমাকে একই সঙ্গে আমার নিজ দপ্তরের দায়িত্বও পালন করতে হয়। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ওয়ার্ডগুলোর কার্যক্রম দেখভাল করছি।’


তিনি বলেন, ‘আমার কারণে যদি কোনো নাগরিক কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে সরি বলব। কারণ এমনিতে মূল কার্যালয়ের কাজের চাপ অন্যদিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব।


নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে নির্বাচিত কাউন্সিলরের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নাগরিক সেবার জন্য সবচেয়ে ভালো হলো একজন কাউন্সিলর থাকা।’


নেজামুল হক বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওয়ার্ডের দায়িত্ব মূল দপ্তরের কাজের পাশাপাশি পালন করতে হচ্ছে। প্রতি ওয়ার্ডের জন্য ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

 

তিনি বলেন, ‘এর আগে একজন কর্মকর্তা ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এখন দায়িত্বে নেই। পরে আমাকে ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

 

নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ। কয়েক দিন আগে আমার অপারেশন হয়েছে। চিকিৎসক আমাকে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এরপরও দায়িত্বের প্রতি অবহেলা না করে কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চেয়ে জনপ্রতিনিধিরা ভালোভাবে নাগরিকদের সেবা দিতে পারবেন। কারণ তাঁরা ওয়ার্ডের মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন।’

এদিকে এসব ভোগান্তি থেকে দ্রুত নির্বাচন চান নগরবাসী। নগরবাসীর মতে, ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প নেই।


নগরবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে দ্রুত সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ওয়ার্ডের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হলে নাগরিক সেবার মান ও গতি বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/মআস-০৫/আশিক-১৯