ছবি: এআই।

প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে সিলেটের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা সিলেটিদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলেছে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত গড়ে ওঠেছে দৃষ্টিনন্দন বিলাসবহুল বাড়ি, বহুতল আবাসিক ভবন ও সুসজ্জিত ফ্ল্যাট। সড়কে বেড়েছে দামি গাড়ির সংখ্যা। স্বজনদের ভোগ-বিলাসে ব্যয় বাড়লেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের খুব কমই বিনিয়োগ হচ্ছে উৎপাদনশীলখাতে। ফলে সিলেটে গড়ে ওঠছে না শিল্পকারখানা। এই অবস্থার জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়াকে দায়ি করছেন প্রবাসীরা। 


তিন দশক আগেও সিলেটের গড়ে ওঠা যে কোন প্রকল্পের সিংহভাগের বিনিয়োগকারী ছিলেন প্রবাসীরা। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের বিনিয়োগই ছিল বেশি। সিলেটের আবাসন প্রকল্প, বহুতল বাণিজ্যিকভবন ও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে প্রবাসীরা বড় বড় বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু কাঙ্খিত রিটার্ন না পাওয়া, বিনিয়োগের সুরক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টিসহ নানা কারণে তারা এখন বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেছেন। গত সরকারের সময়ে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একটি হাইটেক পার্ক গড়ে তোলা হয়। শুরুতে সেখানে বিপুল প্রবাসীবিনিয়োগ আশা করলেও সাড়া মিলেনি। 


 

এদিকে, একটি বিলাসবহুল বাড়িকে সিলেটের প্রবাসীরা সবসময় আভিজাত্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। তাই নিজেরা না থাকলেও শহর কিংবা গ্রামে হোক- তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি তৈরি করতেন। সারা বছর এই বাড়িগুলো খালি বা তালাবদ্ধ পড়ে থাকে। কিংবা কোটি টাকার বাড়িতে বসবাস করেন কাজের লোক বা আত্মীয়-স্বজন। এ ছাড়া সিলেটের প্রবাসীদের ঝোঁক ছিল জায়গা-জমি ক্রয়ে। একসময় তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ক্রয় করতেন। কৃষি জমি বেশি থাকাটাকেও সিলেটের লোকজন প্রভাব-প্রতিপত্তির স্মারক হিসেবে দেখতেন। কিন্তু পরবর্তীতে এসব প্রাসাদসম বাড়ি ও শ্রম-ঘামে কেনা জমি স্বজনদের সাথে বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে এসবখাতে বিনিয়োগেও আগ্রহ হারান প্রবাসীরা। এছাড়া প্রবাসে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্মের টান কমে যাওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে এখন দেশের সম্পদ বিক্রি করে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে আসে ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। যা দেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত বিভাগগুলোর একটি। আরেক তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে রেমিট্যান্স এসেছে ১ দশমিক ৬২৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিপুল পরিমাণ এই রেমিট্যান্সের কত শতাংশ শিল্পে বিনিয়োগ হয় তার কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।


স্থানীয় গবেষকদের মতে, এই অর্থের ৯০ ভাগই ব্যয় হয়েছে বাসা-বাড়ি নির্মাণ ও দেশে থাকা স্বজনদের ভোগ বিলাসে। ইউকে এনআরবি সোসাইটির পরিচালক এম আহমেদ জুনেদের মতে, দেশে প্রবাসী বিনিয়োগ না হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকা ও পুঁজি ফেরিয়ে নিতে জটিলতা। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে বাঙালি কমিউনিটির তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ কমেছে। তাদেরকে দেশে টানার মতো পরিবেশ তৈরি সম্ভব হয়নি। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রবাসীরা বিনিয়োগ না করে দেশ থেকে সম্পদ বিক্রি করে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে বর্তমানে প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগের উত্তম পরিবেশ বিরাজ করছে উল্লেখ করে প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, অতীতের যে কোন সরকারের চেয়ে বর্তমানর সরকার প্রবাসীদের ব্যাপারে আন্তরিক। এখন দেশে বিনিয়োগের উত্তম পরিবেশ রয়েছে। প্রবাসীরা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ/আশিক-১৬