পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী রাজনীতিবিদ আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ছিলেন সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। গুণধর এই রাজনীতিবিদের ৮৮ বছরের মধ্য ৬৩ বছরই কাটিয়েছেন মানুষের সেবা করে।
সাবেক এই অর্থমন্ত্রী দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়ে গত শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
বরেণ্য এই রাজনীতিবিদ গত ঈদুল ফিতরে নিজের অসুস্থতা আর করোনার কারণে সিলেটে আসতে পারেননি। এর আগের ঈদেও ছিলো এমন অবস্থা। তিনি মনোবাসনা প্রকাশ করেছিলেন, এবারের ঈদ সিলেট এসে উদযাপন করবেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, তাঁর সেই মনোবাসনা কেবল ইচ্ছেতেই আটকে থাকবে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল মাল আবদুল মুহিত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৮ বছর।
সাবেক অর্থমন্ত্রীর ৩টির জানাযার মধ্যে প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে। শনিবার (৩০ এপ্রিল) বেলা ১১টা ৫ মিনিটে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় জানাজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শনিবার বেলা ২টায়। এর পরপরই সেখান থেকে মরদেহ সিলেটের পথে রওয়ানা হয়।
শনিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে মুহিতের মরদেহ সিলেট এসে পৌঁছে। সড়কপথে সিলেটে আসে লাশ। রবিবার দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ফুল আর চোখের জলে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে শেষ বিদায় জানান সর্বস্তরের সিলেটবাসী। ওইদিন বেলা ২টা ১৮ মিনিটে সাবেক অর্থমন্ত্রীর জানাযার নামাজ সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে সিলেট নগরীর রায়নগরস্থ পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে মরদেহ দাফন করা হয়।
মৃত্যুর আগে গত ২১ মার্চ গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন- ‘যেখানেই ছিলাম না কেন বা থাকি না কেন, সিলেট আমাকে খুব টানে। আমি আবার সিলেট যাব।’
এই ঈদে সিলেটে আসার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদেরও জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী তাঁকে সিলেটে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও করেছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু এর আগেই আবুল মাল আবদুল মুহিত চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
এর আগে দীর্ঘ আড়াই বছর পর গত ১৪ মার্চ আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেটে এসেছিলেন। করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকার বাসা থেকে বাইরে তিনি খুব একটা বের হননি। তাই দীর্ঘ সময় সিলেটে আসা হয়নি। ২০২১ সালের ২৫ জুলাই তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত মার্চের শুরুতে আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন কিছুদিন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ১৪ মার্চ সিলেটে আসেন। সিলেট সিটি করপোরেশন ১৬ মার্চ তাঁকে ‘গুণী শ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ দেয়। সে অনুষ্ঠানে মুহিত আবারও সিলেটে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তাঁর জীবন ‘মহাতৃপ্তি আর মহাপ্রাপ্তির’।
সিটি করপোরেশনের সম্মাননা অনুষ্ঠানটি ছিল আবুল মাল আবদুল মুহিতের সর্বশেষ কোনো সভায় অংশ নেওয়া। সিলেটের সুরমা নদীর পারে দাঁড়িয়ে সেদিনের সম্মাননা অনুষ্ঠানে মুহিত বলেন, ‘আমি একান্তভাবে সিলেটের সন্তান। নিজের পিতৃভূমিতে আমি অতিথি, এটা গর্বের বিষয়। নিজের অরিজিনে এসে এমন সম্মান পাওয়া, এমন স্বীকৃতি পাওয়া আমার জন্য আনন্দের।’
আবুল মাল আবদুল মুহিতের ঘনিষ্ঠজন সূত্রে জানা গেছে, তিনি যখনই সিলেট নিয়ে কথা বলতেন, তখনই তিনি নিজ শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করতেন। আলোকিত সিলেটের স্বপ্নদ্রষ্টাও ছিলেন তিনি। সিলেটের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুইবার অর্থমন্ত্রী ও সাংসদ থাকাকালে এই অঞ্চলের জন্য নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। যা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এসব ছাড়াও তাঁর বিভিন্ন বইয়েও সিলেট নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বসিত মন্তব্য রয়েছে। বিশেষত তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা ‘সোনালি দিনগুলি’ (২০১৬) এবং ‘আমার সিলেট’ (২০১৯) বই দুটিতে মূলত সিলেটের প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে এসেছে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মুহিত। স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষক।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া আবদুল মুহিত বরাবরই একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫৬ সালে আবদুল মুহিত যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সিএসপি হওয়ার পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনাসচিব হন। এর আগে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন তিনি। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হলে সেপ্টেম্বরে মুহিত হন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক।
১৯৭৭-৮১ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ছিলেন তিনি এবং ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী করার প্রস্তাব দিলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে রাজি হন। শর্তটি ছিল নির্দলীয় সরকার গঠন করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
এরশাদ কথা না রাখলে দুই বছরের মাথায় মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মুহিত। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সরকার তাঁকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তা দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মুহিত বই লিখেছেন ৪০টি।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর বর্ণাঢ্য অর্থনৈতিক জীবনে ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেন, যার ১০টি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




