দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট, নৈসর্গিক অপরূপ সৌন্দর্য্যে ভরপুর সিলেটের জাফলংয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ফি নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসন। জনপ্রতি প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয় ১০ টাকা।

এই কার্যক্রমের তদারকি করছে জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন। পর্যটকদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে জাফলংয়ে নির্ধারণ করা হয় তিনটি পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করতে গত ৭ মাস ধরে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ফি দিতে হচ্ছে পর্যটকদের। 


রশিদের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত স্বেচ্ছাসেবকরা গ্রহণ করেন ফি। তবে এই ফি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জাফলংয়ে ঘটে গেছে রক্তারক্তি কাণ্ড। ফি দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবকরা ঢাকা থেকে এক পর্যটক পরিবারের ৬ সদস্যকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছেন। নারীদেরও করা হয়েছে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা। এই অব্স্থায় জাফলংয়ে ফি আদায় নিয়ে নতুন করে ভাবছে জেলা প্রশাসন। 

জানা গেছে, সাত দিন পর এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে আলোচনাসাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, ঈদ উপলক্ষে আগামী সাত দিন পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টিকিট বাবদ টাকা আদায় করা হবে না। জাফলং সবার জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও (ইউএনও) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের জন্য আগামী সাত দিন জাফলং উন্মুক্ত থাকবে। 

তিনি বলেন, যেহেতু আগের জেলা প্রশাসক স্যারের সময়ে একটা মিটিংয়ে এ প্রবেশ ফি নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাই আরেকটা মিটিং করে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল মূলত পর্যটনকেন্দ্রের ভেতরটি মেইনটেন্যান্সের (ব্যবস্থাপনা) জন্য। সাত দিন পর একটা মিটিং ডাকব। সেখানেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ঈদ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সিলেটের জাফলংয়ে বেড়াতে আসা লাখো পর্যটকের মধ্যে ছিলো ঢাকার একটি পরিবার। এ দলে ৮ নারী ও শিশুসহ তারা ১২ জন ছিলেন। বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে কাউন্টারে এক শিশুর টিকিট কেনাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে কাউন্টারের স্বেচ্ছাসেবকদের বাগবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে কাউন্টারে থাকা উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক লাঠি, কাঠের টুকরো ও লোহার পাইপ দিয়ে পর্যটকদের বেধড়রক মারধর শুরু করেন। তখন পাশে থাকা এক তরুণী ও কোলে শিশুবাচ্চা নিয়ে এক নারী হামলা থামানোর চেষ্টা করলে তারাও হামলার শিকার হন। এসময় নারীদের শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন হামলার শিকার পর্যটকরা। হামলায় ৬ নারী-পুরুষ আহত হন। পরে তাদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। ঘটনার দিন রাতেই হামলার শিকার পর্যটকরা ঢাকায় ফেরেন।

ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার ভিডিও এবং ছবি মুঠোফোনে ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিলে বিকেল ৫টার দিকে উপজেলা প্রশাসন ও জাফলং সাব জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক ঘটনাস্থলে যান। পরে হামলাকারী ৫ স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতার করে গোয়াইনঘাট থানাপুলিশ। হামলার ঘটনায় আহত সুমন নামের এক পর্যটক বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

হামলার শিকার পর্যটকরা অভিযোগ করেছেন- ঘটনার সময় জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেও সহায়তা পাননি তারা। বৃহস্পতিবার রাতে জাফলং গ্রিন রিসোর্টের সামনে ভুক্তভোগী পর্যটকরা তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন গণমাধ্যর্মীদের কাছে। এসময় তারা বলেন, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সাহায্য চাওয়া হয়। পুলিশ হামলার ছবি মুঠোফোনে তুলে পাঠানোর কথা বলে। পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে হামলার ঘটনার ভিডিও ফেসবুক ও অনলাইন গণমাধ্যমের মাধ্যমে ভাইরাল হলে বিকেলে পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়। আটক করে ৫ জনকে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- গোয়াইঘাটের পন্নগ্রামের মৃত রাখা চন্দ্রের ছেলে লক্ষ্মণ চন্দ্র দাস (২১), ইসলামপুর গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে মো. সেলিম আহমেদ (২১), নয়াবস্তি এলাকার ইউসুফ মিয়ার ছেলে সোহেল রানা, পশ্চিম কালীনগর গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে নাজিম উদ্দিন ও ইসলামপুর রাধানগর গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দীনের ছেলে জয়নাল আবেদীন।

তাদেরকে শুক্রবার দুপুরে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। 


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম