‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ প্রবাদটির সত্যতা যেন আবারও প্রতিয়মান হলো। প্রায় ৭৬ ঘন্টা ধরে পড়েছিলো মায়ের মরদেহ। লাশের পাশেই হয়তো খেলছিলো ১৪ মাস বয়েসি নুরি নামের অবুঝ শিশুটি। তালাবদ্ধ ঘরে কোনো খাবার তো দূরের কথা- এক ঢোক পানিও দেওয়ার কেউ ছিলো না। একসময় সে জ্ঞান হারিয়ে নেতিয়ে পড়ে মায়ের লাশের পাশেই। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। নুরি বর্তমানে সুস্থ আছে।
ঘটনাটি সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ থানাধীন বালুচর এলাকার। মঙ্গলবার দিবাগত (২৪ আগস্ট) রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই শিশুকে ঘরের দরজার তালা ভেঙে উদ্ধার করে পুলিশ। সঙ্গে উদ্ধার করে ওই শিশুর মায়ের লাশ।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বালুচর এলাকার সেকান্দর মহলের নিচতলার একটি ইউনিটের তালাবদ্ধ দরজা ভেঙে আফিয়া বেগম (৩১) নামের ওই গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। এসময় মৃতদেহের পাশেই অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় আফিয়ার ১৪ মাস বয়েসি শিশুকন্যাকে।
আফিয়া বেগম সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার জাঙ্গাইল তুয়াকুল গ্রামের আজির উদ্দিনের মেয়ে।
আফিয়ার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ- এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আর এতে আফিয়ার স্বামী জড়িত। আফিয়ার স্বামীর নাম নিয়াজ উদ্দিন। তিনি ওমানে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দেশে ফেরেন এবং আফিয়ার দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেফতারের পর জেলও খাটেন। ৮ দিন আগে তিনি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন। এরপর থেকে আফিয়ার স্বামীর কোনো খোঁজ মিলছে না। নিজাম সম্পর্কে আফিয়ার বাবার পরিবারের সদস্যরা আর কোনো তথ্য দিতে পারছে না। এমনকি তার পূর্ণ ঠিকানাও বলতে পারছে না।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগরীর বালুচরের সোনার বাংলা আবাসিক এলাকার সেকান্দর মহল নামক (৩৬৪ নং) পাঁচতলা বাসার নিচতলার একটি ইউনিটে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন আফিয়া বেগম। প্রায় দুই বছর আগে ওই বাসা ভাড়া নেন তিনি। তিনি তার শিশুকন্যা নিয়ে একাই ওখানে থাকতেন। গত দু-তিন দিন থেকে প্রতিবেশিরা আফিয়াকে দেখতে পাননি। মঙ্গলবার রাতে তার ঘরের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। এতে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সন্দেহ হয় এবং দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তারা দেখতে পান- আফিয়ার ইউনিটের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। এরপর তারা পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে আফিয়ার মরদেহ খাটের পড়ে থাকতে দেখে। মরদেহ থেকে উৎকট দুর্গন্ধ বের হচ্ছিলো। মৃতদেহের পাশেই অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় আফিয়ার শিশুকন্যা নুরিকে। তখন পুলিশ শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে দেখে দ্রুত তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। শিশুটি এখন সুস্থ আছে।
এদিকে, আফিয়ার মৃত্যু নিয়ে রহস্যজট সৃষ্টি হয়েছে। তার বাবা, ভাই ও বড় বোন সিলেটভিউ-কে জানান- তাদের পরিবার হতদরিদ্র। আফিয়াকে বেশ কয়েক বছর আগে সিলেট মহানগরীতে এক নারী চিকিৎসকের বাসায় কাজ করার জন্য দেন। ওই নারী চিকিৎসক প্রায় ১০ বছর আগে আফিয়াকে নিয়াজের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের কয়েক বছর পর নিয়াজ প্রবাসে চলে যান। গত দুবছর আগে তিনি দেশে ফিরলে পরিবাারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আফিয়ার সঙ্গে কলহের সৃষ্টি হয়। এসময় আফিয়ার বাবার বাড়িতে এ বিষয়ে বিচারসালিশও হয়। পরে বিষয়টি আর সমাধানের পথে যায়নি এবং নিয়াজ ফের ওমানে চলে যান।
আফিয়ার বাবার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ- নিয়াজ কয়েক বছর ধরে আফিয়া ও তার সন্তানের ভরণ-পোষণ করছেন না। বিষয়টি নিয়ে আফিয়া স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেন। কিছুদিন আগে নিয়াজ দেশে ফিরলে এ মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন। ৮ দিন আগে জামিন নিয়ে নিয়াজ কারাগার থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি লাপাত্তা।
নিয়াজের বাড়ি কোথায় বা তার অন্যান্য বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে পারছে না আফিয়ার পরিবার।
আফিয়ার বড় বোন বলেন- ‘ওদের সঙ্গে আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিলো না। আমার বোন (আফিয়া) তার সন্তানকে নিয়ে ওই বাসায় একাই থাকতেন। ৪ দিন আগে আমাদের সঙ্গে আফিয়ার সর্বশেষ ফোনে কথা হয়। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। এরই মাঝে গতকাল (মঙ্গলবার দিবাগত) রাত দেড়টার দিকে পুলিশ আমাদের ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেন।’
এ বিষয়ে শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান বুধবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে সিলেটভিউ-কে বলেন, ‘বাসার দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিলো। প্রাথমিক ধারণা- এটি হত্যাকাণ্ড। তবে ঘটনাটি রহস্যজনক। বিভিন্ন দিক সামনে নিয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। আমরা বেশ কিছু ক্লু (সূত্র) পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এ মুহুর্তে এসব বলা যাচ্ছে না।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




