সেকুলারিজমের মোড়কে ভারত দিন দিন মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে উঠেছে। সংখ্যার দিক দিয়ে তৃতীয় মুসলিম প্রধান দেশ ভারত। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর, ভারতেই সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস। ১৪৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা ২০ কোটি ও হিন্দু জনসংখ্যা ১১৫ কোটি। ভারত সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ৩০ অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণের  কথা বলা হয়েছে। এমনকি ১৯৭৬ সালে ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা সংশোধন করা হয়, যাতে স্পষ্টভাবে ভারতকে একটি সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষ) রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।


কয়েক দশক আগেও সেখানকার মুসলিমরা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া হিন্দু-মুসলিমরা পাশাপাশি মিলেমিশেই থাকত। হিন্দুদের পালা-পার্বনে, পুজা-আর্চনায় মুসলিমরাও সামিল হতেন। আবার মুসলিমদের ঈদ আনন্দসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিন্দুদের অংশগ্রহণও ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও গভীর হয়েছে। গত কয়েক বছরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক মন্তব্য ও হামলা অনেক বেড়ে গেছে।


ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক দশকের শাসনামলে দেশটিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার ক্রমশ কমে আসছে। সংশোধিত সলিমবিরোধী নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) করা হয়েছে। দেশটির একমাত্র মুসলিম অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করেছে মোদি সরকার। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে নির্মিত হয়েছে রামমন্দির। একাধিক রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি পবিত্র রমজান মাসে গরুর মাংস বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের উপর সহিংস হয়ে উঠেছে। মুছে ফেলা হচ্ছে মুঘল আমলের বিভিন্ন নাম ও স্মৃতিচিহ্ন। নগর উন্নয়নের কথা বলে নোটিশ ছাড়াই শত শত ভারতীয় মুসলমানদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ভারত নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দাবি করলেও বছরের পর বছর মুসলিমদেরকে নিধন করতে উঠে পড়ে লেগেছে।


১৯৯০ সাল বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর বিবিসির মতে, ৯০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয় এবং পুলিশের গুলি বর্ষণে আড়াই হাজার মানুষকে আহত করা হয়। শুধু তাই না ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা ছিল বিভৎস ও নারকীয়। তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আজকের ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গুজরাটের গোধরা নামক রেল স্টেশনে রেলগাড়িতে কে বা কারা অগ্নি সংযোগ করে। এই অগ্নি সংযোগের দায় সুপরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানো হয়। এরই প্রতিশোধ হিসাবে তৎকালীন অনেক ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট মোতাবেক, মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উস্কানিতে মুসলমানদের ওপর হামলা করা হয়। এই হামলায় ২ হাজার মুসলমান নিহত হন। এই হামলার পর দেশ এবং বিদেশে নরেন্দ্র মোদি ‘গুজরাটের কসাই’ হিসাবে কুখ্যাতি লাভ করেন। ২০১৩ সালে উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগরে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় কয়েকশত মুসলমানকে হত্যা এবং ৫০ হাজারেরও বেশি মুসলমান ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়। এছাড়াও, ২০২০ সালে দিল¬ীতে অন্তত ৭০ জন মুসলমান নিহত হন। দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কিন্তু দিল¬ীর আইনশৃঙ্খলা ছিল কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ বিজেপি সরকারের হাতে। পুলিশ এই দাঙ্গা থামানোর পরিবর্তে নিজেরাও দাঙ্গায় যোগ দেয়। ভারতের নাগরিক এবং তাদের কাছে দেশটির বৈধ পরিচয়পত্র তাকা সত্বেও ২২ জানুয়ারি ২০২০ ভারতে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে একটি বস্তির প্রায় দুইশ মুসলমানের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
 

সেকুলারিজম এর মোড়কে ভারত কতটা ধর্মবিদ্বেষী তা বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ধর্মীয় জনগোষ্ঠী হিসেবে সেখানকার মুসলিমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর একটি প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতে ১ হাজার ১৬৫টি সংখ্যালঘুবিদ্বেষী বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৬৮টি। রাজনৈতিক সমাবেশ, ধর্মীয় সভা, প্রতিবাদ মিছিল ও সাংস্কৃতিক জমায়েতের মতো জায়গায় এসব বক্তব্য লক্ষ্য করা যায়। এতে ভারতে মাত্র এক বছরেই মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স এর তথ্য অনুযায়ী ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যগুলোর ৯৮ দশমিক ৫ শতাশই সংখ্যালঘু মুসলিমদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের সংখ্যালঘুদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণের অভিযোগ এনেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোও।     

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ভারতে লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৬৩ শতাংশ ভাষণ ছিল ঘৃণা উদ্রেককারী। নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার পর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদির দেওয়া ১৭৩টি বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য দিয়েছেন তারা। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবিøউ) জানিয়েছে, ১৭৩টির মধ্যে ১১০টি (৬৩ শতাংশ) ভাষণে মোদি ‘ইসলামভীতি’ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই মুসলমানদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় ধ্বংস করেছে এবং এমন সব কাজ করেছে, যা বেআইনি। নির্বাচনের পর এই কার্যকলাপ অব্যাহত রয়েছে। ফলে সারা দেশে অন্তত ২৮টি হামলার খবর পাওয়া গেছে। যার কারণে ১২ জন মুসলমান পুরুষ ও ১ জন খ্রিষ্টান নারীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালের ২ মে ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ) নিজেদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্বের কারণে ভারতকে কালো তালিকায় রাখার সুপারিশ করার পাশাপাশি ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসাবে আখ্যায়ীত করেছে।
 

সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। ভারতে ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা যে সম্পত্তি ধর্মপ্রচার এবং সমাজের উন্নতিকল্পে দান করেন, সেটাকে ওয়াকফ বলে। এই ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করা যায় না বা ব্যবসায়ীক স্বার্থে ব্যবহার করা যায় না। সাধারণত কোনো জনসেবার কাজে ব্যবহৃত হয় এই জমি। অথবা কেউ উত্তরসূরী হিসেবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। এই সম্পত্তি কখনও হস্তান্তর করা যায় না। সাধারণত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবর, মসজিদের জন্য, গরিব মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য জমি ব্যবহার করা হয়। ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য আলাদা বোর্ড বা কমিটি গড়ার ধারণা ভারতে শুরু হয় সেই সুলতানি আমল থেকে। দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই ওয়াকফ বোর্ডের ধারণা তৈরি হয়। এই বোর্ডের মূল কাজ ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করা। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৪ সালে পাশ হয় ওয়াকফ আইন। ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ আইন সংশোধন করে, ওয়াকফ বোর্ডকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের সেই একচ্ছত্র অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ কি না, সেই চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনও আধিকারিকের হাতে। এর পাশাপাশি আপত্তি উঠেছে নতুন বিলে ওয়াকফ বোর্ডে দুই অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তির বন্দোবস্ত নিয়েও।
 

পুরনো আইন অনুযায়ী কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ সম্পত্তি ঘোষণা করলে, চিরদিনের জন্য সেটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবেই থেকে যেত। নতুন বিল পাশ হলে এবার সেটাকেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে। ফলে যে সম্পত্তি ওয়াকফ বোর্ডের বলে ঘোষণা করে, তাতে ইসলামিক ধর্মস্থান বা অন্য কোনও ইসলামিক প্রার্থনাস্থল তৈরি হলেও সেটাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতেও বাবড়ি মসজিদের মতো স্থাপনা গুলোকে ভেঙ্গে ঘর-বাড়ি কিংবা মন্দির তৈরি করা হবে। এতে মুসলমানদের নিয়ে ভারত সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং মুসলিমবিদ্বেষী চিন্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের প্রতি এরকম আচরণ সারা বিশ্বে রাষ্ট্র ব্যবস্থা কে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
 


লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।