বর্তমান বিশ্বে অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা এবং ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে  | এসব রোগের পেছনে বংশগত কারণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ  | বিশেষ করে কোমল পানীয়, ফ্রুট ড্রিংক, এনার্জি ড্রিংক এবং বিভিন্ন মিষ্টি পানীয়ের মাধ্যমে মানুষ অজান্তেই বিপুল পরিমাণ চিনি গ্রহণ করছে |  

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্য সংকটের কারণ হতে পারে |

একটি সাধারণ ২৫০ মি.লি. কোমল পানীয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম চিনি থাকতে পারে, যা প্রায় ৬ থেকে ৭ চা-চামচ চিনির সমান |  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  (WHO)     মতে একজন সুস্থ মানুষের সারাদিনে মোট ২৫ গ্রামের বেশি চিনি খাওয়া উচিত নয় | মাত্র একটি  কোমল পানীয় (২৫০ মিলি)  পান করলেই দৈনিক মোট সীমা অতিক্রম করা যায় |

অনেক সময় একজন
ব্যক্তি দিনে একাধিক বোতল পানীয় পান করেন | ফলে তার দৈনিক চিনির গ্রহণমাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক উপরে চলে যায় |  সমস্যা হলো, এসব পানীয় আমাদের পেট ভরালেও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ বা আঁশ সরবরাহ করে না |  

অর্থাৎ আমরা ক্যালরি পাচ্ছি কিন্তু পুষ্টি পাচ্ছি না |


চিনি শরীরের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয় |  আমাদের শরীর শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে | কিন্তু যখন অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি গ্রহণ করা হয়, তখন শরীর সেই অতিরিক্ত শক্তিকে চর্বি হিসেবে জমা করতে শুরু করে | দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ওজন বৃদ্ধি পায় এবং স্থূলতা দেখা দেয় | 

বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে স্থূলতাকে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে |

অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ |  যখন আমরা নিয়মিত মিষ্টি পানীয় পান করি, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় | এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে অগ্ন্যাশয়কে অধিক পরিমাণ ইনসুলিন উৎপাদন করতে হয় | বছরের পর বছর এই চাপ চলতে থাকলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয় |

পরবর্তীতে এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রূপ নিতে পারে |

হৃদরোগের সঙ্গেও অতিরিক্ত চিনির সম্পর্ক রয়েছে | অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়ায়, ভালো কোলেস্টেরল কমায় এবং প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি করে | এসব পরিবর্তন হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় | তাই শুধুমাত্র চর্বিযুক্ত খাবার নয়, অতিরিক্ত চিনিও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর |
লিভারও অতিরিক্ত চিনির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে | কোমল পানীয়ে থাকা ফ্রুক্টোজ নামক চিনির একটি বড় অংশ লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয় | অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ( সরল শর্করা) গ্রহণ করলে লিভারে চর্বি জমতে শুরু করে এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ে | 

বর্তমানে এমন অনেক মানুষ 
ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হচ্ছেন যারা কখনও মদ্যপান করেন না | এর একটি কারণ হলো অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় গ্রহণ |


দাঁতের স্বাস্থ্যও চিনিযুক্ত পানীয়ের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় | মুখের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া চিনি ব্যবহার করে অ্যাসিড তৈরি করে | এই অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে এবং ক্যাভিটি সৃষ্টি করে | শিশুদের মধ্যে দাঁতের ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো কোমল পানীয় ও মিষ্টি পানীয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার |

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুতর |  অল্প বয়সে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তারা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে | ফল, সবজি, দুধ বা পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে তারা মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়  |  এর ফলে শিশুদের  অপুষ্টি ও স্থূলতা একই সঙ্গে দেখা দিতে পারে |


বাংলাদেশে কোমল পানীয়ের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে | গ্রামাঞ্চল থেকে শহর সব জায়গায় সহজলভ্য হওয়ায় শিশু ও তরুণদের মধ্যে এসব পানীয়ের ব্যবহার বাড়ছে |  

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণের মধ্যে পুষ্টি শিক্ষা বৃদ্ধি করা জরুরি |  মানুষকে জানতে হবে যে কোমল পানীয় তৃষ্ণা মেটানোর সর্বোত্তম উপায় নয় | তৃষ্ণা মেটানোর জন্য বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই | এছাড়া ডাবের পানি, চিনি ছাড়া লেবুর শরবত এবং তাজা ফল স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে |

পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  | বাবা-মাকে শিশুদের সামনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের উদাহরণ তৈরি করতে হবে | ঘরে নিয়মিত কোমল পানীয় রাখার পরিবর্তে ফল ও নিরাপদ পানীয় রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত |

স্কুল পর্যায়েও পুষ্টি শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সঠিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হয় |
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জনসচেতনতা কর্মসূচি বৃদ্ধি করা দরকার | 

 স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সামাজিক সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে |  অনেক দেশে চিনিযুক্ত পানীয়ের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ, স্কুলে বিক্রি সীমিত করা এবং সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবহার করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে  | এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে |


আমাদের মনে রাখতে হবে, সব খাবার নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই | মাঝে মাঝে উৎসব বা বিশেষ উপলক্ষে কোমল পানীয় পান করা যেতে পারে | তবে এটিকে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ বানানো উচিত নয় |

নিয়মিত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুললে শরীর ও মন উভয়ই উপকৃত হবে |


কোমল পানীয়ে থাকা অতিরিক্ত চিনি আধুনিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব হুমকি | এটি ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে এবং অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে |  সুস্থ সমাজ গড়তে হলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে | আজকের সচেতন সিদ্ধান্ত আগামী দিনের সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে  | 


 আসুন, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নিই এবং নিজেদের ও আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিই।

 

লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমকম (হিসাব বিজ্ঞান) এমপিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য), কনসালটেন্ট, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার।