​কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা মানেই উৎসবের আমেজ, আর এই উৎসবের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে নানা পদের মাংসের আয়োজন |

 ঈদের এই সময়টাতে সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের রোগীদের মাংস খাওয়ার ব্যাপারে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ ও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। 
ফলে, সচেতনতার আলোটি বেশিরভাগ সময়ই তাদের ওপরই নিবদ্ধ থাকে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানের একজন কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, আরেকটি নীরব শ্রেণী এই উৎসবের দিনগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন, যাদের নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম হয়  তাঁরা হলেন ‘হাইপোটেনশন’ বা নিম্ন রক্তচাপের (Low Blood Pressure) রোগী।


​অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে, রক্তচাপ কম থাকলে বুঝি কোরবানির মাংস যত খুশি খাওয়া যায়, এতে কোনো ক্ষতি নেই।  জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণাটি শুধু ভুলই নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে।

 কারণ অতিরিক্ত লাল মাংস (Red Meat) বা পশুর চর্বি রক্তচাপ কম বা বেশি— সবার জন্যই সমান ক্ষতিকর।
​নিম্ন রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে ঈদের খাদ্যতালিকায় মূলত দুটি বিষয়কে মাথায় রেখে পুষ্টি পরিকল্পনা করা উচিত  প্রথমত, রক্তচাপকে স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা এবং দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত মাংসের কারণে পরিপাকতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের ওপর যেন বাড়তি চাপ না পড়ে তা নিশ্চিত করা।


​চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি শব্দ আছে— 'পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল হাইপোটেনশন' (Postprandial Hypotension)। ঈদের দিনে অনেক সময় দেখা যায়, আনন্দের আতিশয্যে বা অনেক পদের রান্নার কারণে রোগীরা একবারে পেট পুরে প্রচুর পরিমাণে ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে ফেলেন। ভারী খাবার হজম করার জন্য তখন শরীরের সিংহভাগ রক্ত চলাচল পাকস্থলী ও অন্ত্রের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে সাময়িকভাবে ব্রেইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং রক্তচাপ হঠাৎ আরও নিচে নেমে গিয়ে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার সৃষ্টি হয়। তাই হাইপোটেনশনের রোগীদের জন্য 
 একবারে বেশি না খেয়ে, অল্প অল্প করে সারা দিনে কয়েকবারে (Small, frequent meals) খাবার গ্রহণ করুন।

​দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো হাইড্রেশন বা শরীরের পানির ভারসাম্য। লাল মাংস একটি উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার। এই প্রোটিন বিপাক বা হজম প্রক্রিয়ার জন্য শরীরের প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। ঈদের ব্যস্ততায় বা গরমে যদি পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয়, তবে শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। আর ডিহাইড্রেশন হলে রক্তচাপ আরও মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তাই মাংস খাওয়ার পাশাপাশি দৈনিক অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি লাচ্ছি খাওয়া জরুরি।

​ মাংসের পুষ্টিগুণ ও রান্নার পদ্ধতিতে। হাইপোটেনশন রোগীদের রক্তস্বল্পতার কারণেও অনেক সময় প্রেসার কম থাকে। গরুর বা খাসির চর্বিহীন মাংসে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন থাকে, যা তাদের জন্য উপকারী। তবে মাংস কাটার সময় দৃশ্যমান চর্বিগুলো পুরোপুরি ছেঁটে বাদ দিতে হবে। অতিরিক্ত তেল, ঘি বা ডালডা দিয়ে ভুনা করার চেয়ে হালকা মসলায় ঝোল করে বা গ্রিল/কাবাব আকারে মাংস খাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।


​ পুষ্টিবিজ্ঞানের মূল কথাই হলো ‘পরিমিতিবোধ’ (Moderation)। মাংসের চর্বি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রোক বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় তা রোগী উচ্চ রক্তচাপের হোন কিংবা নিম্ন রক্তচাপের। তাই মাংসের প্লেটের পাশাপাশি টেবিলে রাখতে হবে প্রচুর পরিমাণে শসা, টমেটো ও লেবুর সালাদ। লেবুর ভিটামিন-সি মাংসের আয়রন শোষণে সাহায্য করবে এবং সালাদের ফাইবার বা আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করবে। খাবারের পর কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি পরিহার করে পুদিনা পাতার বোরহানি বা টক দই খাওয়া যেতে পারে।


​ঈদের আনন্দ সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ। তবে সেই আনন্দ যেন সুস্থতার সীমানা ছাড়িয়ে না যায়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতাই পারে নিম্ন রক্তচাপের   Hypotension রোগীদের একটি সুস্থ ও প্রাণবন্ত ঈদ উপহার দিতে |


 

​মনজুরুল মা আবুদ: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য)।