“বিশ কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি!”
— কবি চরণটি আজ যেন আরও বেশি নির্মম সত্য হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে মৃত্যুর প্রায় সাত দিন পর। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো— ঈদের দিনও কেউ তাঁর খোঁজ নেয়নি। একই শহরে বসবাস করেও সন্তানদের কারও মনে হয়নি, “মা কেমন আছেন?”


এই ঘটনার ভয়াবহতা শুধু একটি নিঃসঙ্গ মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের গভীর নৈতিক সংকটকে উন্মোচন করেছে। কারণ, মৃত ওই নারীর সন্তানরা কেউ অশিক্ষিত নন। কেউ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ নামকরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশফেরত উচ্চশিক্ষিত, কেউ শিক্ষিকা। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, পদমর্যাদা আছে, সামাজিক প্রতিষ্ঠা আছে— শুধু মানবিকতা নেই।

প্রশ্ন হলো, তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে কী শিখাচ্ছে?
আমরা আজ সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, অধ্যাপক বানাতে মরিয়া; কিন্তু একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কতটা সচেতন? বাস্তবতা হলো— পুঁথিগত বিদ্যা আর সুশিক্ষা এক বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ একজন মানুষকে দক্ষ পেশাজীবী বানাতে পারে, কিন্তু মানবিক মানুষ বানাতে পারে না— যদি পরিবার, সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা অনুপস্থিত থাকে।

বর্তমান সমাজে সফলতার সংজ্ঞা যেন কেবল চাকরি, বেতন, পদ-পদবি ও সামাজিক মর্যাদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অথচ একজন মানুষ সত্যিকারের সফল তখনই, যখন তিনি নিজের দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ ও মানবিকতার পরিচয় দেন। যে মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, সেই মা যদি শেষ বয়সে অবহেলা, অনাহার, চিকিৎসাহীনতা ও নিঃসঙ্গতায় মৃত্যুবরণ করেন— তবে সন্তানের সব অর্জনই অর্থহীন।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। পরিবারে পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধাবোধ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বৃদ্ধ বাবা-মা আজ অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের কাছে দায়িত্ব নয়, বোঝা হয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে— ইতিহাস মানুষকে তার পদবি দিয়ে নয়, মানবিকতা দিয়ে মনে রাখে। একজন মানুষ কত বড় কর্মকর্তা ছিলেন, কত ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন— সময়ের সঙ্গে তা ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু তিনি কতটা মানবিক ছিলেন, কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন— সেটিই থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে।

তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার। পরিবারে সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষায় নয়, মানবিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত করতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার চর্চা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।

কারণ শিক্ষা তখনই সফল, যখন তা মানুষকে মানুষ হতে শেখায়।
 


লেখক: মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।