একসময় শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে দেশের শীর্ষস্থানে ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। তবে গত তিন-চার বছরে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানের ব্যাপক অবনতি হচ্ছে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েবমেট্রিক্স এর পরিসংখ্যান অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শাবিপ্রবির অবস্থান ছিল তৃতীয়, যা বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৬০০-৮০০ এর মধ্যে। ২০২২ সালে একধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে জায়গা করে নেয় শাবিপ্রবি। কোয়াকোয়ারেলি সাইমন্ডসের (কিউএস) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ছয় ধাপ পিছিয়ে শাবিপ্রবির অবস্থান হয়েছিল দেশের মধ্যে অষ্টম (বিশ্বে ৪০১-৪৫০ তম)। কিন্তু ২০২৪ সালে তা পিছিয়ে ১৩তম স্থানে নেমে আসে। নেদারল্যান্ডভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার এর স্কোপাস ডাটার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত তালিকায় শাবিপ্রবি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তৃতীয় এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২তম স্থানে অবস্থানে ছিল।
গত বছর স্পেনের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমাগো প্রকাশিত র্যাঙ্কিং-২০২৫ অনুযায়ী, গবেষণা, সামাজিক প্রভাব ও উদ্ভাবনে শাবিপ্রবি ১৮ ধাপ পিছিয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮তম স্থানে নেমে গেছে। এমনকি দেশে গবেষণায় সেরা দশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাতেও জায়গা হয়নি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এক সময় দেশ সেরা অবস্থানে থাকলেও এখন পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসছে।
সিনিয়র অধ্যাপকরা মনে করেন, বিশ^বিদ্যালয়ের কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারাই এর মূল কারণ। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের মানদন্ড অনুযায়ী গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ও গুণমান, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, শিক্ষকদের পিএইচডি ডিগ্রির হার, গবেষণা বাজেট, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিশ্বব্যাপী একাডেমিক ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা- এসব ক্ষেত্রেই শাবিপ্রবি কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মানদÐের নিরিখে শাবিপ্রবির এই পিছিয়ে পড়ার নেপথ্য যেসব কারণ রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো-
ই-রিসোর্সের সংকট:
একটি মানসম্মত গবেষণার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সেই বিষয়ের ওপর হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও যুগান্তকারী কাজগুলো সম্পর্কে জানা। আর এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল, ই-বুক এবং ডেটাবেজের অবাধ প্রবেশাধিকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের শাবিপ্রবি বর্তমানে গবেষণার এই মৌলিক ও অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামালের চরম সংকটে ভুগছে। গবেষণায় কোটি কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ থাকার পরেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জার্নালগুলোর সাবস্ক্রিপশন না থাকায় শাবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এসব ডাটাবেইজে এক্সেস পাচ্ছেন না। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং হাই-ইম্প্যাক্ট জার্নালগুলো (যেমন: ন্যাচার, সায়েন্স, এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার, আইইইই, টেইলর এন্ড ফ্রান্সিস) সাধারণত মুক্ত বা ওপেন-অ্যাক্সেস নয়।
শাবিপ্রবির লাইব্রেরি থেকে এই নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অধিকাংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক সাবস্ক্রিপশন নেই। ফলে শিক্ষকরা যখন কোনো আধুনিক বিষয়ের ওপর পড়াশোনা বা পূর্ববর্তী গবেষণা (লিটারেচার রিভিউ) পর্যালোচনা করতে যান, তখন তারা ‘পেওয়াল’-এর মুখোমুখি হন। অর্থাৎ, একটি মাত্র গবেষণাপত্র পড়ার জন্য ৩০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত দাবি করা হয়, যা ব্যক্তিগত খরচে বহন করা একজন শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। এসবে প্রাতিষ্ঠানিক এক্সেস না থাকায় অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে ‘পাইরেটেড’ অথবা নি¤œমানের ওপেন-অ্যাক্সেস জার্নালের ওপর নির্ভর করছেন। এটি শাবিপ্রবির মতো একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণার মৌলিকত্ব নষ্টের অন্যতম কারণ। ফলে কিউ-১ জার্নালে পাবলিকেশন করাটাও সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে।
ওয়েবসাইট হালনাগাদ না করা:
গবেষণা ও শিক্ষা খাতের আধুনিক বৈশ্বিক পরিমÐলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট কেবল নোটিশ বোর্ড নয়। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের ‘ডিজিটাল ফেস’ বা বৈশ্বিক পরিচিতির মূল প্রবেশদ্বার। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা তাদের ওয়েবসাইটকে কতটা গুরুত্ব দেয়। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে দেখা যাবে তাদের প্রতিটি বিভাগের রিয়েল-টাইম ডাটা, উদ্ভাবন, খ্যাতিমান এলামনাই, চলমান ল্যাব গবেষণা, এবং ফান্ডিংয়ের তথ্য প্রতি সপ্তাহে, এমনকি প্রতিদিন হালনাগাদ হচ্ছে। তাদের একটি কেন্দ্রীয় আইটি ও পিআর টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে যাতে কোনো পুরোনো বা ভুল তথ্য ওয়েবসাইটে না থাকে। কিন্তু আমাদের শাবিপ্রবির ওয়েবসাইট ভর্তি তথ্য, নোটিশ, ফ্যাকাল্টি ইত্যাদির সংগ্রহশালা। অনেক বিভাগের শিক্ষকদের প্রোফাইলে গেলে দেখা যায়, ৫ থেকে ৭ বছর আগের পুরোনো তথ্য ঝুলছে। শিক্ষক উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ফিরলেও বা নতুন কোনো বড় গবেষণা সম্পন্ন করলেও তা ওয়েবসাইটে সময়মতো স্থান পায় না। এই স্থবিরতা আন্তর্জাতিক পরিমÐলে কাউন্ট হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো ‘ওয়েবমেট্রিক্স’। তারা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের চারটি সূচক মূল্যায়ন করে, তা হলো- ভিজিবিলিটি (দৃশ্যমানতা), এক্সিলেন্স (গবেষণা), ওপেননেস (উন্মুক্ততা) এবং প্রেজেন্স (উপস্থিতি)। বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সমস্ত গবেষণাপত্র, কনফারেন্স পেপার ও প্রাতিষ্ঠানিক ডাটা ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ বা উন্মুক্ত করে রাখে, যা তাদের ওয়েবসাইটের ট্রাফিক এবং গে¬াবাল সাইটেশন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শাবিপ্রবির ওয়েবসাইটে এসব পর্যাপ্ত না থাকায় সার্চ ইঞ্জিনগুলো যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ডাটা খোঁজে, তখন শাবিপ্রবির নাম আসে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবমেট্রিক্স ও সিমাগো র্যাঙ্কিংয়ে।
শিক্ষকদের অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিষ্ক্রিয়তা:
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষকের অ্যাকাডেমিক পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার মানদÐ এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে। কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন কিংবা সিমাগোর মতো আন্তার্জাতিক র্যাঙ্কিং সংস্থাগুলো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের সময় সরাসরি শিক্ষকদের অনলাইন অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল এবং তাঁদের সক্রিয়তা মূল্যায়ন করে। আন্তর্জাতিক মহলে একজন গবেষকের প্রথম পরিচয় তৈরি হয় তাঁর গুগল স্কলার, স্কপাস, ওয়েব অব সায়েন্স এবং অর্কিড অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। শাবিপ্রবির অনেক শিক্ষকেরই এই অ্যাকাউন্টগুলো নেই, অথবা থাকলেও তা বহু বছর ধরে আপডেট করা হয়নি। ফলে র্যাঙ্কিং সংস্থাগুলোর স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান খোঁজে, তখন তারা ইন্টারনেটে শিক্ষকদের এই প্রোফাইলগুলো স্ক্যান করে। শিক্ষকের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় বা আপডেট না থাকার ফলে গবেষণার কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না।
এ ছাড়াও, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটি গবেষণা প্রকাশ করল, তার চেয়েও বড় মানদÐ হলো সেই গবেষণাগুলো পৃথিবীর অন্যান্য গবেষকরা কতবার ব্যবহার (সাইটেশন) করেছেন। একজন শিক্ষক যখন একটি উচ্চমানের গবেষণা করেন, তখন সেটি যদি রিসার্চগেট, স্কোপাস বা পাবলোনস -এর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে আপলোড বা আপডেট করলে অন্য গবেষকরা তা জানতে পারেন। কিন্ত গবেষণাপত্র ডিজিটাল দুনিয়ায় দৃশ্যমান না হলে তার ‘সাইটেশন’ বাড়ে না। আর সাইটেশন না বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এইচ-ইনডেক্স’ সূচক কমে যায়, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে শাবিপ্রবিকে পেছনের সারিতে ঠেলে দিচ্ছে।
বিদেশি শিক্ষার্থী সংকট:
একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্বমঞ্চে কতটা গ্রহণযোগ্য, তার অন্যতম বড় মাপকাঠি হলো সেখানে কতজন আন্তর্জাতিক বা বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কিউএস কিংবা টাইমস হায়ার এডুকেশন বিশ্বের প্রতিটি মর্যাদাপূর্ণ র্যাঙ্কিংয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট রেশিও’ বা বিদেশি শিক্ষার্থীর অনুপাতের জন্য নির্দিষ্ট ও বড় অঙ্কের স্কোর বরাদ্দ থাকে। একসময় কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী দেখা গেলেও, বর্তমানে ক্যাম্পাসটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী শূন্যতায় ভুগছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩-০৪ থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত শাবিপ্রবিতে ডিগ্রি নিয়েছেন ১৫ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ১০ জন ছিলেন নেপালের, চারজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এবং একজন ফিনল্যান্ডের। এরপর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত আটটি ব্যাচে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী টানতে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এর অন্যতম কারণ বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণার অভাব। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী টানতে বিশেষ সেল বা 'ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস' পরিচালনা করে। কিন্তু শাবিপ্রবির এমন কোনো সক্রিয় আন্তর্জাতিক প্রচার সেল নেই। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তির যোগ্যতা, খরচ, স্কলারশিপ বা সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত কোনো ডেডিকেটেড, আকর্ষণীয় এবং হালনাগাদ পোর্টাল নেই। যার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নজর কারতে পারেনি বিশ^বিদ্যালয়টি।
তাই এখন সময় এসেছে সিলেটের পূণ্যভূমির এই বিশ^বিদ্যালয়টিকে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উচু করে দাড় করানোর। সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
লেখক : শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।




