বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে তার জনসংখ্যাভিত্তিক বিশাল কর্মক্ষম শ্রেণি এবং তার মধ্যে বিশেষত তরুণ ও মেধাবী জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর কাঁধে ভর করেই বাংলাদেশ তার ভবিষ্যতের উন্নয়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই অমূল্য সম্পদ প্রতিনিয়ত দেশ ত্যাগ করছে উন্নত বিশ্বের দিকে, মূলত উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে। আর অনেকে ফিরে না এসে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এখনো অনেক পিছিয়ে। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই, আধুনিক ল্যাব বা সরঞ্জাম নেই, এমনকি পাঠ্যক্রমও অনেকাংশে যুগোপযোগী নয়। শিক্ষকতার মান, গবেষণা প্রকাশের সংখ্যা ও মান, প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা, এসব মেধাবীদের বিদেশমুখী হতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী উন্নত গবেষণার সুযোগ পেলে সহজেই দেশের বাইরে চলে যায় এবং উন্নত মানের গবেষণা সুবিধা ও প্রফেশনাল দিকনির্দেশনার কারণে আর ফিরে আসে না।
জনগণের ঘামের টাকায় অর্জিত সম্পদ ব্যয় করে রাষ্ট্র বুয়েটে থেকে একজন প্রকৌশলী তৈরি করলেও দিনশেষে পঞ্চপান্ডের একগাদা ইতিহাস মুখস্থ করে বিসিএস নামক সোনার হরিণের দিকে ঝুঁকছে। এটা কি শুধুই ব্যক্তির পছন্দ নাকি রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তা ভেবে দেখাটাও জরুরি। বড় বড় মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন কিংবা বিদেশি প্রকৌশলী ভাড়া করে রাষ্ট্রের জনগণের ঘাড়ে ব্যয় চাপানো হচ্ছে। অথচ পরিচর্যার অভাবে দেশত্যাগ করা বুয়েট, ঢাবি কিংবা শাবিপ্রবি থেকে পাশ করা ছেলেটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দক্ষ প্রকৌশলীর ভ‚মিকা পালন করছে। নিজেদের মেধা-মনন, দক্ষতা আর বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশল কাজে লাগিয়ে অন্য দেশের জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান রাখলেও আমাদের দেশে তার লেশটুকুও দেখার জুড়ি মিলছে না। আমরা তাদের ধরে রাখতে যুগের পর যুগ ব্যর্থ হচ্ছি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তার মুখ্য কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং এবং ওয়েবমেট্রিক্স র্যাঙ্কিংয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের মতো নিয়ন্ত্রণহীন ভ‚খন্ডের কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পেলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমাদের সেই অবস্থান তৈরি হয়নি। হবেই বা কি করে! দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের রাজনৈতিক চর্চার অঘোষিত আঁতুড়ঘর হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির নামে লাগামহীনভাবে হলগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতন, র্যাগিং, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক মিছিল মিটিংয়ে নেওয়া, চাঁদাবাজি ও আবাসিক শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক হল থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে কলুষিত করেছে।
বাংলাদেশে চাকরি বাজারে স্বচ্ছতা ও মেধা-ভিত্তিক নির্বাচন এখনো নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন এসবই নিয়োগ ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে। একটি মেধাবী তরুণ যখন দেখে, তার চেয়ে কম যোগ্য কেউ রাজনীতি বা অন্য কোনো উপায়ে চাকরি পাচ্ছে, তখন তার মাঝে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেন না। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এমনকি উদ্যোক্তারাও বিদেশে স্থায়ী হচ্ছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর হাজারের বেশি বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষে সে দেশেই কাজ করতে থাকেন। একই চিত্র কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে দেশ এক অদৃশ্য মেধা-ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মুক্ত সমাজের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক মতের পার্থক্যের কারণে তরুণদের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা দেখা গেছে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির নামে সহিংসতা, শিক্ষক নির্যাতন, ক্যাম্পাস দখল, হল দখল মেধাবীদের উচ্চশিক্ষা জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। একজন মেধাবী তরুণ যদি নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা ও চিন্তাশীল জীবনযাপন করতে না পারে, তবে সে বিদেশে যাওয়ার জন্য সর্বস্ব ব্যয় করতেও দ্বিধা করে না। কারণ, বিদেশে সে শুধু মানসম্মত শিক্ষা নয়, নিরাপদ ও স্বাধীন পরিবেশও পায়।
উন্নত দেশগুলোতে স্টার্ট-আপ সংস্কৃতি, নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, এবং উদ্যোক্তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় বা প্রাইভেট বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। সেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীই কোনো নতুন আইডিয়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করে ফেলতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। নানা ধরনের হিপোক্রেসি, নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুঁজি সংকটের কারণে একজন তরুণ উদ্যোক্তা তার উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবায়ন করতে পারে না। এই সুযোগের অভাবও মেধাবীদের দেশের বাইরে ঠেলে দেয়, যেখানে তারা শুধু উন্নত প্রযুক্তির সান্নিধ্যই নয়, বরং সঠিক নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতাও পায়।
উন্নত বিশ্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিরাপদ, শৃঙ্খলিত এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রা। সেখানে নাগরিক হিসেবে একজন মানুষ তার মৌলিক অধিকার ভোগ করে। মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, অবসরকালীন সুবিধা, কর কাঠামোতে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা- এসব বিষয় মানুষকে সমাজে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভ‚তি দেয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে দুর্নীতি, আইনি সহায়তার অভাব, পরিবেশ দূষণ, যানজট, অপরাধ, এসবই তরুণদের বিদেশমুখী করে তোলে।
একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও নীতিতে তরুণ সমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণ একেবারেই সীমিত। শিক্ষানীতির সংস্কার, শিল্পনীতি, পরিবেশনীতি বা কর্মসংস্থানের কৌশল নির্ধারণে তরুণদের মতামত নেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। ফলে তারা মনে করে, তাদের কোনো জায়গা নেই রাষ্ট্রীয় চিন্তাধারায়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের ‘অ্যালিনেশন’ যা শেষে মেধা পাচারের দিকে ঠেলে দেয়।
রাষ্ট্র এখনো মেধা পাচারকে ‘সমস্যা’ না ভেবে সেটাকে অর্জন হিসেবেই দেখে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সকে যেমন অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়, তেমনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া তরুণদেরও সফলতার নজির হিসেবে তুলে ধরা হয়। উচ্চশিক্ষিত বা দক্ষ কর্মজীবীরা বিদেশে ভালো আয় করেন এবং দেশে অর্থ পাঠান, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায়। রাষ্ট্র এটিকে এক ধরনের লাভ হিসেবেই দেখে। কিন্তু এই লাভ খুবই ক্ষণস্থায়ী ও একমুখী যেখানে রাষ্ট্র শুধু টাকা পাচ্ছে, কিন্তু হারাচ্ছে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও যোগ্য নেতৃত্ব। বিদেশে বসবাসকারী একজন প্রকৌশলী বা গবেষক দেশে থেকে গেলে সে হয়তো বাংলাদেশকে আরো অনেক বেশি অবদান দিতে পারতেন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে, উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, কিংবা শিক্ষক হয়ে হাজার তরুণকে অনুপ্রাণিত করে।
ইউনেস্কোর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের মধ্যে বড় অংশই চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও গবেষক যারা দেশে থাকলে জাতীয় উন্নয়ন কাঠামোতে বড় ভ‚মিকা রাখতে পারতেন।
রাষ্ট্র যদি এই মেধা পাচারকে সমস্যা হিসেবে না দেখে, তবে সেই রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেই গুলিয়ে ফেলছে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো দিয়ে হয় না, সেটি হয় উদ্ভাবন, নেতৃত্ব, এবং মানবিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে। ফেইসবুক, গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে নয়, বরং একটি মেধাবান পরিবেশ, উদার চিন্তাভাবনা এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মাধ্যমে। বাংলাদেশ যদি তার গবেষণাগার উন্নত না করে, শিক্ষায় প্রকৃত বিনিয়োগ না করে, তরুণদের জন্য যোগ্য কর্মক্ষেত্র তৈরি না করে, তাহলে সে প্রতিনিয়ত নিজের ভবিষ্যৎকে বিদেশি রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার নীলনকশা আঁকবে।
লেখক: মো. মোফাজ্জল হক, শিক্ষার্থী, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।




