মধ্যপ্রাচ্যের ভ‚-রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা পারমাণবিক সংকটকে ঘিরে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে।


সম্প্রতি ইরানে হামলার পর নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন কর্মসূচি বন্ধে আগাম ব্যবস্থা হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, তেহরান ইতিমধ্যে ৯টি পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের মতে, এটি ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে প্রশ্ন উঠেছে: ইরানে সামরিক হামলা চালিয়ে কী সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ রুদ্ধ করা সম্ভব? আর ইসরায়েল কি সেই সক্ষমতা রাখে?
 

ইতিহাসে নজর দিলে দেখা যায়, ইসরায়েল ১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লিতে এবং ২০০৭ সালে সিরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনায় সফল বিমান হামলা চালিয়েছিল। এতে পারমাণবিক কর্মসূচিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইরানের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন।
 

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এককেন্দ্রিক নয়; বরং এগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং অধিকাংশই ভ‚গর্ভস্থ ও সুরক্ষিত। যেমন নাতানজ ও ফোর্দো স্থাপনাগুলো গভীর ভ‚গর্ভে নির্মিত, যেগুলো ধ্বংস করতে হলে প্রয়োজন হবে বিশেষ ‘বাঙ্কার বাস্টিং’ বোমা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিমান হামলা।

ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা উন্নত হলেও এককভাবে এমন জটিল অভিযানে সফলতা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অস্ত্র না দিলে ও আকাশপথে হামলা চালাতে সহায়তা না করলে পারমাণবিক স্থাপনা ফর্দোর ক্ষতি করার মতো সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়। ভ‚গর্ভস্থ এসব স্থাপনা ধ্বংস করার মতো বোমা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান বি-২-এর পক্ষেই এসব বোমা দিয়ে হামলা চালানো যায়, যেটা ইসরায়েলের কাছে নেই। তাছাড়া এ ধরনের অভিযানে ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের আকাশসীমা ব্যবহার করতে হবে, যা ক‚টনৈতিকভাবে অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া যায়।
 

এই হামলা কেবল পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সাময়িক বিলম্ব ঘটাতে পারবে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। ইরানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিজ্ঞানী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো পারমাণবিক কর্মসূচি আবার শুরু করা তাদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এর তথ্য মতে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়ে তৎপরতা বাড়ায়, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই তারা সেটা করতে পারবে। এদিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি বিষয়ক সংস্থা আইএইএ গত সপ্তাহে বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা দরকার তার কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম মজুত করেছে, যা দিয়ে নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি চায় তাহলে কয়েক মাসের মধ্যে তারা এটা তৈরি করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড গত ২৫ মার্চ সিনেটের গোয়েন্দা কমিটিকে জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা কোনো পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
 

এসব সামরিক হামলা ইরানের জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরোধ শক্তিকে উসকে দিতে পারে, যার ফলে পুরো অঞ্চলেই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। হিজবুল্লাহ, হামাসের মতো ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দ্বিগুণ শক্তিতে কাজ করবে। একইসাথে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।

ইসরায়েলের সামরিক হামলা হয়ত রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান সাফল্য দিতে পারে, কিন্তু তার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। ইরান হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে, যার প্রথম শিকার হবে ইসরায়েল নিজেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে ইসরায়েল যে কৌশল অবলম্বন করেছে তাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল বয়ে আনবে না। ইরানে চালানো অতর্কিত এই সন্ত্রাসী হামলা পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ নয় বরং ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করবে।
 


লেখক: মো. মোফাজ্জল হক, শিক্ষার্থী সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।