নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে তেমনি দলের ভেতরে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান হাল ধরার পর পরই দলের ভেতরে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেসব আসনে বিকল্প আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা দাঁড়িয়েছেন। তাদেরকে ঢাকায় ঢেকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্বার্থে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালে মনোনয়ন দাখিলকারি নেতারা তার ডাকে সাড়া দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন।

 


তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের নির্বাচন থেকে ইতোমধ্যে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান। এবার আলোচনা এসেছে বিভাগের অন্যান্য আসনগুলোর স্বতন্ত্র আর বিকল্প প্রার্থীদের নিয়ে। মিজানের পর এখন কারা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন এ নিয়ে সিলেটে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তারেক রহমান সিলেট সফরে কোন ভেদাভেদ না রেখে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন দলের বিভক্ত হওয়া নেতাকর্মীদের। স্বতন্ত্র আর বিকল্প প্রার্থীদের ব্যাপারে সিলেট সফরের আগেই সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র জানায়।

 

সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনেও দ্বৈত সমীকরণ থাকলেও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচন সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী। এখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের পক্ষে মাঠে নামার অনুরোধ জানানো হয় মিজানকে। মিজান চৌধুরী ২০১৮ সালেও নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বদ্বিতা করেছিলেন। সাবেক ছাত্রনেতা ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রতিপক্ষকেমাঠে মরণ কামড় দিয়েছেন।

 

এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র আর বিকল্প প্রার্থী নিয়ে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ডে। এসব প্রার্থী একদিকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন, অন্যদিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে দল। যদিও তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়। একই সাথে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন মাঠের কর্মী ও নেতারা। মাঠের নেতারা চান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের আগে স্বতন্ত্র, বিকল্প প্রার্থীর জট খুলে দেওয়ার। নতুবা ঐক্যবদ্ধ স্লোগানের বদলে বিভক্তির স্লোগানে প্রকম্পিত হতে পারে সিলেটের সমাবেশগুলো।

 

দলীয় সূত্র জানায়, স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হওয়া বিদ্রোহী নেতাদের শিগগিরই ঢাকায় ডেকে নিবেন তারেক রহমান। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝানোর চেষ্টা করবেন দলের শীর্ষ এই নেতা। দল ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হবে। তাতেও কাজ না হলে সাংগঠনিক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে।

 

সিলেট বিভাগে তিনটি আসনে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ছাড়াও বিকল্প প্রার্থী রেখেছে বিএনপি; যা সাংগঠনিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিলেট-৬ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবারও তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলকে। যিনি এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হতে এহেন কোনো উদ্যোগ নেই, যা তিনি নেননি। সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেল। যিনি তৃণমূলের একটি বড় অংশের সমর্থন পাওয়ার দাবি করছেন নির্বাচন প্রস্তুতির শুরু থেকেই।

 

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন বিএনপিরই দাপুটে নেতা শেখ সুজাত মিয়া। ভোটের মাঠে তার শক্ত অবস্থানের কারণে এ আসনে ধানের শীষের বিজয় নিয়ে এখনই ভাবিয়ে তুলেছে দলের নেতাকর্মীদের। ড. রেজা কিবরিয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে।

 

এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ড. রেজা কিবরিয়া। তখনো ধানের শীষ চেয়ে বঞ্চিত হয়েছিলেন শেখ সুজাত। এবারও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সুজাত সিরিয়াস প্রার্থী। ফলে এ আসনে ভোটের সমীকরণ নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে।

 

সিলেট-৫ আসনে সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি এ আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মনোনয়ন প্রত্যাশী, জেলা বিএনপির প্রথম সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন (চাকসু মামুন) বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে ইতোমধ্যে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তাতে মামুন থমকে না গিয়ে আরও জ¦লে উঠেছেন। মামুনের কট্টর অবস্থানের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের সাবেক আলোচিত ছাত্রনেতা সিদ্দিকুর রহমান পাপলু এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন।

 

বিভিন্ন জনসভায় পাপলু দাবি করছেন, মামুন জামায়াতের এজেন্ট। আর মামুন বলছেন, কে কী বলল এসবে তিনি কান দেন না। এদিকে বহিষ্কারের পরও মামুন দমে না যাওয়ায় ভাগে পাওয়া আসন নিয়ে টেনশনে জমিয়ত প্রধান মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।

 

এবার সিলেট বিএনপিতে বিকল্প ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে যেমন আলোচনা- সমালোচনা রয়েছে; অনেক এলাকায় তারা বিএনপির জন্য কৌশলগত সুবিধাও তৈরি করতে পারে এমন মতও অনেকের। দলের কেউ কেউ মনে করছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াবে। সংগঠনের কর্মীদের সক্রিয় রাখবে। তাতে মাঠে দলের অবস্থান শক্তিশালী হবে, তৃণমূলে মাঠ থাকবে বিএনপির দখলে।

আবার অন্যরা বলছেন, দলের পুঁজির ভোটই যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে তবে তা বিএনপি বিরোধীদের ভাগ্য খুলে দিতে পারে। আর নির্বাচনে দলে বিভক্তির কূফল দলে দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিটি