জাতীয় নির্বাচনে সিলেটে বরাবরই ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভোট। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ফুলতলী পীরের সংগঠন ‘আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র ভোট ব্যাংক। আস ইসলাহ’র কোন নেতা কোন আসনে প্রার্থী না হওয়ায় অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কাছে কদর বেড়েছে দলটির।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এখন প্রার্থীরা ‘সনাতন ধর্মাবলম্বী, চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী ও আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’- এই তিন ভোট ব্যাংক নিজেদের আয়ত্ত্বে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপি, জাাময়াত ও দল দুটির নেতৃত্বাধীন জোটের শরীক প্রার্থীরা এই তিন ব্যাংকের ভোট পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট জেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুই লক্ষাধিক, চা শ্রমিকদের অর্ধলক্ষাধিক ও ফুলতলী পীরের দলের অন্তত ৫ লাখ ভোট রয়েছে।
সিলেট জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভোট সবচেয়ে বেশি রয়েছে সিলেট-১ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে। আসনটিতে মোট ভোটার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জনের মধ্যে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন পুরুষ ও ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন নারী। সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে এক লাখের কাছাকাছি।
আর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার দাবি আসনটিতে চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে ২০ হাজারের উপরে। আসনটিতে আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র ভোট ৩০ হাজারের বেশি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মাওলানা মঈনুল ইসলাম পারভেজ। এই তিনভোট ব্যাংক মিলে সিলেট-১ আসনে ভোটের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ।
ইতোমধ্যে সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে আল ইসলাহ। আর বাকি দুই ব্যাংকের ভোট নিজেদের পক্ষে রাখতে চা শ্রমিক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান।
সিলেটের ৬টি সংসদীয় আসনের চারটিতেই রয়েছে চা শ্রমিকদের ভোট। এর আগে চা বাগানের ভোট ব্যাংক ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকার সুযোগ নিতে বিএনপি ও জামায়াত নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। দফায় দফায় বৈঠক করে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, বাসস্থান, চিকিৎসা ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুব্যবস্থাসহ জীবনমান উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সিলেট-১ আসনে ১২টি বাগান রয়েছে। এসব বাগানে ২০ হাজারের বেশি চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে। সিলেট-৩ আসনভূক্ত ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩টি বাগানে প্রায় ৬-৭ হাজার, সিলেট-৪ আসনের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় ১০টি বাগানে ২০ সহস্রাধিক ও সিলেট-৫ আসনের কানাইঘাট উপজেলায় ২টি বাগানে ২ হাজারের বেশি ভোট রয়েছে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে চা শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারণার কারণে এবারও চা শ্রমিকদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ রয়েছে। তবে কী পরিমাণ শ্রমিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তা এখনও অনুমান করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৬ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী সিলেট জেলায় ভোটার সংখ্যা ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০১ জন। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোটার রয়েছেন প্রায় ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সে হিসেবে সিলেট জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার রয়েছেন প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ৪৩০ জন।
সিলেট জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য জানান, জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট সবচেয়ে বেশি রয়েছে সিলেট-১ আসনে। এছাড়া সিলেট-২, ৩ ও ৪ আসনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিন্দু ভোটার রয়েছেন।
ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ফুলতলী পীরের দল:
সিলেটে আলেম-ওলামাদের মধ্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ছিলেন প্রয়াত মাওলানা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী। সিলেট বিভাগের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তিনি ফুলতলীর পীর হিসেবে পরিচিত। এই পীরের হাতেগড়া সংগঠন হচ্ছে ‘আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হলেও সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে সংগঠনটির অসংখ্য নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্খি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন ফুলতলী পীরের ছোট ছেলে ও আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী। জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন সময়ে দলটির একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এটাই ছিল প্রথম বিজয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন ফুলতলী পীরের দলের প্রার্থীরা।
সিলেট জেলার মধ্যে ফুলতলী পীরের সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) ও সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনভূক্ত জকিগঞ্জের বাদেদেওরাইলে ফুলতলী পীরের বাড়ি। জকিগঞ্জ থেকে বিগত দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র প্রার্থী।
এছাড়া সিলেট-৩ আসনভূক্ত দক্ষিণ সুরমা থেকে ৩ বার ও ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে ১ বার ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন আল ইসলাহ’র প্রার্থী। সিলেট-২ আসনের বিশ্বনাথ ও সিলেট-৬ আসনের গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন ফুলতলী পীরের দলের। ফলে বিশাল এই ভোট ব্যাংকের আর্শিবাদ পেতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরীর সাথে দেখা করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দলের নেতাকর্মীদের আল ইসলাহ’র পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মাওলানা মঈনুল ইসলাম পারভেজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সিলেট জেলার ৬টি আসনে আল-ইসলাহ’র প্রায় ২০ শতাংশ ভোট রয়েছে। সমর্থন পেতে বিভিন্ন দলের নেতা ও প্রার্থীরা আল-ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরীর সাথে দেখা করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থীকে দলের পক্ষ থেকে সমর্থনও দেওয়া হয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ




