সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের প্রকাশিত ডায়েরির প্রক্টরিয় নীতিমালার অন্তর্গত ‘ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের প্রতি আবশ্যকীয় নির্দেশনাবলি’ শিরোনামে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
প্রক্টরিয় নীতিমালার ১০ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো যাবে না, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবমাননাকর মন্তব্য করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কোনো পোস্ট দেওয়া বা শেয়ার করা যাবে না। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও লোগো ব্যবহার করে কোনো আইডি, পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব বিধান অমান্য করলে প্রক্টরিয়াল নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
প্রথম দৃষ্টিতে এই নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও মর্যাদা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সত্যিই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ রোধ করা একটি জরুরি বিষয়। তবে প্রশ্ন হলো এই নীতিমালা কি কেবল শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে, নাকি এর আড়ালে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?
মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (ইউডিএইচআর) এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। একইভাবে বাংলাদেশের সংবিধানেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ মানুষ তার মতামত, কথা, লেখা, প্রকাশনা, সংবাদমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে সাধারণত মুক্ত চিন্তা, বিতর্ক ও সমালোচনার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে যদি মত প্রকাশের ক্ষেত্র অতিরিক্তভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ডিজিটাল আইন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করে তোলে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময় প্রণীত আইসিটি অ্যাক্ট এর ৫৭ ধারা একসময় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। ওই ধারায় “মানহানিকর” বা “রাষ্ট্রবিরোধী” বিবেচিত অনলাইন বক্তব্যের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এই আইন সমালোচনামূলক মতামত বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, এমনকি সাধারণ নাগরিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার কারণে আইনি ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।
পরবর্তীতে সেই আইনের জায়গায় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণীত হলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। এসব আইনের ফলে মানুষ মতপ্রকাশের ভয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয় যাকে “সেল্প সেন্সরশিপ” বলা হয়। অর্থাৎ আইনগত শাস্তির ভয়েই মানুষ অনেক সময় নিজের মত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।
শাবিপ্রবির নতুন নির্দেশনাগুলোও একই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে। “বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন পোস্ট দেওয়া যাবে না” এই বাক্যটি বেশ বিস্তৃত এবং ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়। কোনো শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো তুলে ধরেন, তাহলে সেটি কি ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা হিসেবে বিবেচিত হবে? নাকি সেটি গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবে গ্রহণ করা হবে? এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যায়। এমনকি এই নীতিমালা সামনে আসার পর ব্যাপক সমালোচনা করছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তার জায়গা। এখানে প্রশ্ন তোলা, বিতর্ক করা এবং সমালোচনার মধ্য দিয়েই জ্ঞান বিকাশ ঘটে। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে দেখা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদার একাডেমিক সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত মানহানি বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে স্বচ্ছ নীতিমালা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অত্যধিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়।
সুতরাং শাবিপ্রবি প্রশাসনের উচিত নির্দেশনাগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বচ্ছ জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা গেলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
লেখক: মোফাজ্জল ইবনে রুকন, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।




