ছবি: সংগৃহিত
নিজের শেষ বয়সে একটুখানি স্বস্তি বা স্বামী হারানো সংসারে একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তাতে ভ‚মিকা রাখার আশায় ‘বয়স্ক বা বিধবা ভাতা’র কার্ড করার জন্য আবেদন করে বছরের পর বছর সরকারি দপ্তর বা ইউনিয়ন-পৌরসভার বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতেও সিলেটের বিশ্বনাথে কোন আশার আলো দেখছেন না হতদরিদ্র বয়োবৃন্দ নারী-পুরুষ ও অসহায় বিধবা নারীরা।
পৌরসভা-ইউনিয়নের কিংবা ইউনিয়ন পরিষদগুলোর আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে আলোর মুখ দেথছে না তাদের আশার প্রদীপ। ফলে ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বিশ্বনাথ উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার ‘বিধবা ও বয়স্ক ভাতা’র আবেদন বছরের পর বছর ধরে উপজেলা সমাজসেবা অফিসের ডাটাবেইজে ফাইল বন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে উপজেলার ‘বিশ্বনাথ, অলংকারী, রামপাশা, দৌলতপুর ও দেওকলস ইউনিয়ন’র অংশ বিশেষ নিয়ে বিশ্বনাথ পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর ২০২২ সালের ২ নভেম্বর পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ‚্যত্থানের পর সেই নির্বাচিত পরিষদ বাতিল করেন তৎকালীন সরকার। তবে ২০২৩-২৫ সাল পর্যন্তও এই পৌরসভায় বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কোনো সরকারি বরাদ্দ না থাকায়, নিরুপায় হয়ে পৌরসভার অনেক বাসিন্দা বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়ন’সহ পৌরসভা অর্ন্তভুক্ত অন্যান্য ইউনিয়নের বাসিন্দারাও ভাতার জন্য নিজ নিজ ইউনিয়নে আবেদন করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিগত তিন বছর আগে করা সেসব আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি বা বাতিল হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আবেদনগুলো সিস্টেমে ‘পেন্ডিং বা প্রক্রিয়াধীন’ অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। ফলে কাঙ্খিত সরকারি সেবা পাওয়া নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে রয়েছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠির একটি বিরাট অংশ। এমনকি পৌর এলাকার বাইরে থাকা ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের কয়েক হাজার বাসিন্দাদের প্রায় ৩/৪ বছর পূর্বে করা ভাতার আবেদনও অজানা কারণে একইভাবে সিস্টেমে ‘পেন্ডিং বা প্রক্রিয়াধীন’ অবস্থায় ঝুলে থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ডাটাবেইজে প্রায় ৩ হাজার ৪৭টি বিধবা ভাতা, প্রায় ২ হাজার ৯৬টি বয়স্ক ভাতা ও প্রায় ৪৯টি অনগ্রসর জনগোষ্ঠির ভাতার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে। অর্থাৎ লাল ফিতার দৌরত্বে আটকে আছে প্রায় ৫ হাজারেও বেশি হতদরিদ্র-অসহায় মানুষের ফাইল। অথচ বিশ্বনাথ পৌরসভা গঠনের দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর ধরে পেরিয়ে গেলেও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ডাটাবেইজে বিশ্বনাথ পৌরসভা অন্তভর্‚ক্ত হয়নি। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৫ সালের মে মাসে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মূল ডাটাবেইজে অন্তভর্‚ক্ত হয় বা স্থান পায় বিশ্বনাথ পৌরসভা এবং ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে পৌর এলাকার ৩১ জন দরিদ্র জনগণকে ‘বিধবা ও বয়স্ক ভাতা’র আওতায় আনা হয়। যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
পৌরসভার পুরাণ বাজার এলাকার বাসিন্দ প্রান্ত বৈদ্য ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৩ সালে আমি আমার বৃদ্ধা মায়ের জন্য বিধবা ভাতার আবেদন করে ছিলাম। কিন্তু সেই আবেদন করার ৩ বছর ফেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এর ভালো-মন্দ কোন খবর নেই। ইউনিয়ন অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলে পৌরসভায় যেতে, আর পৌরসভায় গেলে বলে বিষয়টি তাদের কাছে নেই। এমনকি নতুন আবেদনও নেয় না। কারণ পুরোণো আবেদনটি সিস্টেমে পেন্ডিং দেখাচ্ছে। পৌরসভা ও ইউনিয়নের এই গোলকধাঁধায় পড়ে আমার মতো হতদরিদ্ররা শেষ, এখানে আমাদের কান্না শুনার বা সাহায্য করার মতো যেনো কেউই নেই আরকি?
অবশ চরণে (পা) ঘরের কোণে বসে দিন কাটানো উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়নের ছোট দিগলী গ্রামের বয়োবৃদ্ধা রিনা বেগম বলেন, আমি বৃদ্ধ মানুষ, ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারিনা। খুবই কষ্ঠ হয়। প্রায় ২/৩ বছর পূর্বে বয়স্ক ভাতার জন্য একটি আবেদন করে ছিলাম আমি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন প্রকারের ভাতা বা ভাতা পাওয়ার কার্ড পাইনি। দীর্ঘদিনে বহুবার ইউনিয়ন ও সমাবসেবা অফিসে যোগাযোগ করেছি, সবসময়ই আমাকে শূন্যহাতে ঘরে ফিরতে হয়েছে। এব্যাপারে ভালো কোন উত্তরও পাইনি। আর তাই এব্যাপারে কোন সুফল না পেয়েই এখন নিরুপায় হয়ে ঘরের কোণায় বসে আছি।
পৌর এলাকার আবেদনের দায়-দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের নয় দাবী করে উপজেলার বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দয়াল উদ্দিন তালুকদার বলেন, বিশ্বনাথ পৌরসভার আবেদনগুলো আমার দেখার কথা নয়, এগুলো পৌর কর্তৃপক্ষ দেখবেন। এবছ আমি আমার পুরো ইউনিয়নের জন্য মাত্র ১৮টি বিধবা ভাতার বরাদ্দ পেয়েছি। আর সেগুলো আমাদের ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে বন্টনও করা হয়েছে। তবে আমি যা বরাদ্ধ পেয়েছি তা আমার নিজের ইউনিয়নের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। তবে চলমান বিধবা ভাতাভোগীদের মধ্যে যদি কেউ মারা যান, তবেই কেবল সেই শূন্য পদে পৌর এলাকার নতুন কোনো আবেদনকারীকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
ভাতার আবেদন সমাধানের ক্ষেত্রে পৌরসভা-ইউনিয়নের এই গোলকধাঁধার ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, গঠনের দীর্ঘদিন ফেরিয়ে গেলেও বিশ্বনাথ পৌরসভা আমাদের ডাটাবেইজে ছিল না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ২০২৫ সালের মে মাসে পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড ফিল্টার করে ‘বিশ্বনাথ পৌরসভা’কে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ডাটাবেইজে অন্তভর্‚ক্ত করেছি। এখন থেকে ক্রমান্বয়ে নতুন আবেদনগুলোর সাথে সাথে পেন্ডিং আবেদনগুলোরও অনুমোদন দেওয়া হবে।
এব্যাপারে বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক জাহিদ বিন কাশেম বলেন, আমি যেহেতু উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি, সেহেতু এব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েই জনসাধারণকে দ্রæত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাব।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/প্রনঞ্জয়/ইকে




