ছবি: সংগৃহিত
পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালতলীতে শনিবার ভোরে মব সন্ত্রাস করে গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়ি। ছবি:
পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জের মাধবখালী ইউনিয়নে মধ্যরাতে ভয়াবহ মব সন্ত্রাস চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি বসতবাড়ি। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার পর ভবনের মালামাল লুট এবং ধ্বংসস্তূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার জন্য পটুয়াখালী-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ-সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বাহিনীকে দায়ী করেছেন ভবন মালিক মিজানুর রহমান লাভলু কাজী। তিনি ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতি। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ওই মব-সন্ত্রাসের প্রস্তুতি চলার বিষয়টি জেলার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফকে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি বাড়িটি।
এক্সকেভেটর দিয়ে বাড়িটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে মাধবখালী ইউনিয়নের কাঁঠালতলী বাজার এলাকায়। মববাজ শতাধিক ব্যক্তির উপস্থিতিতে নারকীয় এই তাণ্ডব শুরুর আগে সরিয়ে দেওয়া হয় সেখানে থাকা দোকানদারসহ অন্যদের। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি বা ভিডিও করছে কি না, সে ব্যাপারেও নজরদারি করা হয় বলে অভিযোগ করেন বাড়ির মালিক লাভলু কাজী। শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে চোখে পড়ে ধ্বংসস্তূপ। মালামাল লুটপাটের পর বাড়ির ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চিহ্ন দেখা যায়।
মীর্জাগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। কে বা কারা, কী কারণে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা জানার চেষ্টা করছি।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লাভলু কাজী সপরিবারে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। একপর্যায়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে প্রায় দেড় বছর জেলে ছিলেন তিনি। কিছুদিন আগে জামিনে ছাড়া পান। এতদিন ওই বাড়িতে তার মা একা বসবাস করতেন। শুক্রবার বিকালে তিনি অসুস্থ হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হন। বাড়িতে কোনো লোকজন না থাকায় রাত ২টা নাগাদ এক্সকেভেটর দিয়ে একতলা ভবনটি ভেঙে ঘরে থাকা মালামাল লুট এবং অগ্নিসংযোগ করে চলে যায় দুর্বৃত্তরা।
লাভলু কাজীর ভাই কাজী মশিউর রহমান বাবলু ফেসবুকে বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কয়েকটি ছবি এবং একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, ‘আমার ভাই কাজী মিজানুর রহমান লাভলু ১ নম্বর মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান। শুক্রবার সন্ধ্যায় আমি ফেসবুক লাইভে এসে বলেছিলাম যে, আমাদের বাড়ি কিছু দুষ্কৃতকারী ভাঙার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে এবং বিএনপি নেতাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম, প্রশাসন ওখানে এসে ফিরে গেছে। কারণ হচ্ছে বিএনপির এমপি জনাব আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নির্দেশে তার ভাই শাহিন চৌধুরী ও তার সহযোগী পলাশ হালদার, মনির খন্দকার, সুমন তালুকদার টুনু, মহাসিন মেম্বার এবং ছাত্রদল সভাপতি প্রার্থী মিরাজসহ বিএনপির লোকজনের নেতৃত্বে বেকু এনে রাতভর ভাঙচুর করে এবং বাসার সব মালামাল লুটপাট করে তারপর আগুন দেওয়া হয়েছে। ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনে আঘাত করছে, ধ্বংসযজ্ঞ করছে, ঠিক একইভাবে দেখেন আপনারা ছবিতে বাড়িটি ভেঙে ফেলেছে। বাসায় আসবাবপত্র স্টিলের আলমারি। এই আলমারির মধ্যে আমার ভাবির দশ ভরি স্বর্ণ ছিল এবং আমার মায়ের সাত ভরি স্বর্ণ ছিল। আরও অনেক মূল্যবান কাগজপত্র ছিল এই আলমারিতে। ছাত্রদল সভাপতি প্রার্থী মিরাজ পাঁচটা ভ্যানে করে ফ্রিজ এবং আরও মূল্যবান যত জিনিসপত্র ছিল, নিয়ে গেছে। কী বলবো, আমরা একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করি আর সেই দেশের জনগণের ভোটের এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর কর্মকাণ্ড দেখে অবাক হয়ে যাই, কিছু বলার ভাষা নেই, আপনারাই বিচার করুন।’
ভবন মালিক লাভলু কাজী বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই নানাভাবে জমিসহ বাড়িটি দখল করার চেষ্টা করছিলেন সংসদ-সদস্য আলতাফ চৌধুরী, তার ভাইসহ পরিবারের লোকজন। থানা পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন-সব জায়গায় গেছেন তারা। কিন্তু আমার বৈধ কাগজপত্র থাকায় সফল হতে পারেননি। আর কোনো উপায় না পেয়ে গভীর রাতে এক্সকেভেটর এনে বিএনপির কয়েক শ লোক মিলে আমার বাড়িটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে মালামাল লুট এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে আমি কোনো অন্যায় করলে তো ৫ আগস্টের পরপরই আমার বাড়িতে হামলা হতো। ২ বছর পর কেন এভাবে মধ্যরাতে ভয়াবহ মব-সন্ত্রাস করে আমার বসতবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এর উত্তর আর বিচার চাই।
আলতাফ চৌধুরী এমপির বাড়ি আর ঘটনাস্থল একই এলাকায় উল্লেখ করে লাভলু কাজী বলেন, আমার বাড়ি-জমি অবৈধ হলে তারা তো আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন। মধ্যরাতে কেন এই হামলা চালানো হলো?
এ ব্যাপারে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. শাহীন চৌধুরী সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ২০০৩ সালে পাবলিক লাইব্রেরির জন্য রেজিস্ট্রি জমি দখল করে লাভলু কাজী বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। এ জমি বা বাড়ি ভাঙচুর নিয়ে আমার বা আমাদের কোনো ইন্টারেস্ট (আগ্রহ) নেই। যতদূর শুনেছি, ফ্যাসিস্ট আমলে তার (লাভলু) অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে। এর সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
মীর্জাগঞ্জ থানার ওসি মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, মাধবখালী ইউনিয়নের কাঁঠালতলীতে একটি বসতবাড়িতে কে বা কারা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বলে সংবাদ পেয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইকে




