ছবি: এআই।
সিলেট সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক। চোরাচালানের জন্য সিলেটের পাঁচ উপজেলার অন্তত একশ’টি পয়েন্ট (স্থান) ব্যবহার করছে কারবারিরা। র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে মাঝে মধ্যে ধরা পড়ছে চালান। অভিযানে ধরা পড়া অস্ত্র ও বিস্ফোরকগুলো ভারতীয় বলে সনাক্ত হয়েছে। তবে এগুলোর গন্তব্য কোথায় বা কারা কী কাজে ব্যবহার করছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছে। অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের মূল কারবারিরাও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। ফলে সীমান্ত দিয়ে
বন্ধ হচ্ছে না চোরাচালান।
সিলেটের তিন দিকই ভারত সীমান্তঘেরা। উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও পূর্বে আসাম রাজ্য। এর মধ্যে আসাম ও মেঘালয়ের সাথে থাকা সীমান্ত দিয়ে বেড়েছে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক চোরাচালান। বিজিবি ও র্যাবের অভিযানে সম্প্রতি বেশ কিছু অস্ত্র ও বিস্ফোরক ধরা পড়েছে। আর মাদকের চালান ধরা পড়ছে প্রতিদিনই।
সূত্র জানিয়েছে, ভারতের মেঘালয়ের চুনাপাথর খনিতে ব্যবহৃত হয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ‘পাওয়ার জেল’ এবং ‘ইলেকট্রিক ও নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর’। চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিলেট সীমান্ত দিয়ে এগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গত কয়েক মাসে বিস্ফোরকের অন্তত ১৩টি চালান আটক করেছে বিজিবি ও র্যাব। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলোর বেশিরভাগই ভারতের ‘আমিন এক্সপ্লোসিভ প্রাইভেট লিমিটেড’র তৈরি।
গত ২৭ জুন সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার সোনাসার এলাকার একটি ইটভাটায় র্যাব ও বিজিবি অভিযান চালিয়ে ১১টি পাওয়ার জেল, ১১টি ডেটোনেটর ও একটি ওয়ান শ্যুটার গান উদ্ধার করে। এর দু’দিন আগে বড়লেখার তারাদরম সীমান্ত থেকে ৩টি পিস্তল, ৩ কেজি বিস্ফোরক, ২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার হয়। ওই এলাকা থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে ২৪টি বিস্ফোরক, ২৩টি ডেটোনেটর ও ৩টি ওয়ানশ্যুটার গান উদ্ধার হয়েছিল।
গত ১৮ জুন রাতে গোলাপগঞ্জের উত্তর কানিশাইল এলাকার একটি ঝোপ থেকে ১টি ওয়ান শ্যুটারগান, ৬টি পাওয়ার জেল, ৮টি ডেটোনেটর ও পুলিশের লুন্ঠিত দুটি টিয়ারশেল উদ্ধার করে র্যাব-৯। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের রায়গঞ্জ থেকে ১৫টি পাওয়ার জেল ও ১৭টি ডেটোনেটরউদ্ধার হয়। কানাইঘাট উপজেলার ধর্মপুর থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪টি বিস্ফোরক ও ১৪টি ডেটোনেটর এবং ৩০ জানুয়ারি কুওরেরমাটি এলাকা থেকে ২৫টি বিস্ফোরক ও ২৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করে র্যাব।
২৯ জানুয়ারি গোয়াইনঘাটের সাতাইন এলাকা থেকে ৮টি বিস্ফোরক, ৮টি ডেটোনেটর এবং ১৫ জানুয়ারি জৈন্তাপুরের কাটাগাঙ এলাকা থেকে ১৪টি বিস্ফোরক ও ১৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। ২৩ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী থেকে কিছু বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। গত ২৮ জানুয়ারি রাতে তাহিরপুরের বারেকেরটিলা ওয়াচ টাওয়ারের পাশ থেকে ১ কেজি ১২৫ গ্রাম বিস্ফোরক ও ১৬টি ডেটোনেটর উদ্ধার হয়। এর আগে ছাতকের ছনবাড়ী সীমান্ত থেকেও বিস্ফোরকসহ একটি রিভলভার উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৯ এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত তারা ৩৫ কেজি ৭৩০ গ্রাম বিস্ফোরক ও ২২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করেছে। এগুলোর পুরোটাই ভারতে উৎপাদিত। একই সময়ে দেশি-বিদেশি ৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড গুলি এবং ১৫৫টি এয়ারগানসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ করে র্যাব। উদ্ধারকৃত এয়ারগানগুলোর বেশিরভাগই ভারতের তৈরি। এসব এয়ারগান পরিবর্তন করে ওয়ান শ্যুটারগান তৈরি করা হতো বলে সূত্র জানিয়েছে। র্যাবের অভিযানে এরকম পরিবর্তিত ওয়ানশ্যুটারগানও উদ্ধার হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীবাজার, বড়চালিয়া, গড়রগ্রাম, মাঝরগ্রাম, কাপনা, লোহারমহল, ভূইয়ারমোড়া, মাদারখাল, নরসিংহপুর, মাইজকান্দি, ছবড়িয়া, বাখরশাল, মানিকপুর, সেনাপতিরচক, ফেউয়া, ইছাপুর, সুলতানপুর, খাদিমান, গঙ্গাজল, সহিদাবাদ, ভক্তিপুর, পিল্লাকান্দী, আমলশীদ, সালেহপুর, উত্তরকুল, লাড়িগ্রাম, উত্তরভাগ, মিয়াগুল, বলরামেরচক, বিয়াবাইল, আইওর, বাল্লা, রসুলপুর, সোনানন্দপুর, দুধেরচক, শিবেরচক ও হাইওরচক সীমান্ত ব্যবহার করে থাকে চোরাকারবারিরা। এসব পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে মাদক ও চোরাইপণ্য আসে।
এর মধ্যে লোহারমহল, ভূইয়ারমোড়া, কাপনা, মাদারখাল, মুন্সিবাজার, বিয়াবাইল, আইওর, উত্তরকুল, আমলশীদ, সুলতানপুর, সহিদাবাদ ও ল²ীবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের সঙ্গে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসে। জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ ও রসুন পাচার হয়ে থাকে।
কানাইঘাট উপজেলার দনা, কাড়াবাল্লা, লোভাছড়া, নুনছড়া, সোনাতনপুঞ্জি, বড়বন্দ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসে মাদক, গরু, মহিষ, সিগারেট, চিনি ও জিরা আসে। দনা ও লোভাছড়া দিয়ে অস্ত্র আসার খবরও সূত্র নিশ্চিত করেছে। দনা সীমান্ত মানবপাচারের জন্যও বেশ পরিচিত।
গোয়াইনঘাট উপজেলার নয়াবাজার লিডারবস্তি, সংগ্রামপুঞ্জি ও হাদারপাড় চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের এই এলাকা দিয়ে ভারত থেকে গরু, মহিষ, প্রসাধনী সামগ্রী, পিয়াজ, টমেটো, কম্বল, কাপড় এবং বিভিন্ন জাতের মাদক প্রবেশ করে। এর মধ্যে সংগ্রামপুঞ্জি ও হাদারপাড় দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসার তথ্য রয়েছে বিভিন্ন সংস্থার কাছে। চোরাকারবারীরা সীমান্ত থেকে চোরাইপণ্য ও অস্ত্র-বিস্ফোরক নিয়ে হাদারপাড়-বঙ্গবীর, সালুটিকর-গোয়াইনঘাট, সোনারহাট-গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট-সারীঘাট, রাধানগর-গোয়াইনঘাট ও জাফলং-তামাবিল সড়ক ব্যবহার করে সিলেট শহরে আসে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বরমসিদ্ধিপুর, মাঝেরগাঁও, উৎমা, তুরং, ভোলাগঞ্জ, চিকাডহর ও ছনবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসে মাদকসহ নানারকম পণ্য। জৈন্তাপুর উপজেলার মোকামবাড়ী, আলু বাগান, শান্তিমাইর জুম, মোকামপুঞ্জি, ছাগলখাউরি, বাননঘাট, শ্রীপুর চা বাগান, মিনাটিলা, কাঠালবাড়ী, কেন্দ্রিবিল, ডিবির হাওর, রাবার বাগান, লম্বাটিলা, ঘিলাতৈল, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা, করিমটিলা, কমলাবাড়ী, ভিরগোল, গোয়াবাড়ী, বাইরাখেল, হর্নি, মাঝেরবিল, কলিঞ্জিবাড়ী, জালিয়াখলা, নয়াগ্রাম, লালাখালের নুরুলের টিলা, অভিনাশ ও লাল মিয়ার টিলা, আফিফানগর, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গিবিল ও বালিদাঁড়া সীমান্ত ব্যবহার করছে চোরাকারবারীরা। এসব পয়েন্ট দিয়ে মাদক, গরু, মহিষ, ভেড়া, ভারতীয় জিরা, কাপড়, কম্বল ও চকলেটসহ বিভিন্ন ধরণের পণ্য ভারত থেকে আসে। এর মধ্যে মোকামবাড়ী, আলুবাগান, শান্তিমাইর জুম ও মোকামপুঞ্জি দিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসার তথ্য রয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা মানবপাচারের রুট হিসেবে পরিচিত।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মো. আবদুল জব্বার জলিল বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক আসার খবর আমাদেরকে উদ্বিঘ্ন করে। নিশ্চয় সীমান্তে আমাদের দুর্বলতা থাকায় চোরাকারবারিরা সুযোগ পাচ্ছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে এই চক্রের মুলহোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
সীমান্তে চোরাচালান প্রসঙ্গে জানতে বিজিবি সিলেট সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল সালাহ উদ্দিন ও সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. নাজুমল হকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
বিজিবি-১৯ ব্যাটালিয়নের (জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন) অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. জুবায়ের আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। একঘন্টা পর তিনি কল দিবেন বলে আশ্বস্থ করেন। কিন্তু একঘন্টা পর একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
র্যাব-৯ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী জানান, সিলেটে যেসব বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো ভারতের পাথরখনিতে ব্যবহৃত হয়। সেখান থেকে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে সিলেটে আসে। ধারণা করা হচ্ছে এগুলো ক্রাসার মেশিনে বড় পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত এগুলো নাশকতার কাজে ব্যবহারের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারত থেকে আসা বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে যারা ধরা পড়ে তারা বাহকমাত্র। ‘ক্রস বর্ডার’ চক্রের হোতাদের সনাক্ত করতে র্যাব কাজ করছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ শাদিআচৌ




