ছবি: সংগৃহিত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী সিলেটের হুমায়ুন কবিরের ‘বিদেশি নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য’ এবং তাদের নিয়োগ ও শপথের ‘সাংবিধানিক বৈধতা’ যাচাই চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে। নোটিস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম মিয়া।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে নোটিসটি পাঠানো হয়। নোটিসে সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আসলাম মিয়া গণমাধ্যমকে নোটিসের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে তিনি উচ্চ আদালতে রিট মামলা করবেন।
তিনি বলেন, খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা থেকে বিষয়টি তার নজরে এসেছে। বিষয়টি সাংবিধানিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিধায় তিনি এই আইনি নোটিস দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের ১৭ মে খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে তারুণ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার সমাবেশে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘আপনার সরকারে (মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) একজন বিদেশি নাগরিককে (খলিলুর রহমান) আপনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন। আপনার কী সেই আক্কেল জ্ঞান নাই। একজন বিদেশি নাগরিকের কাছে এই দেশের সেনাবাহিনী নিরাপত্তাসংক্রান্ত রিপোর্ট প্রদান করবে কীভাবে ভাবলেন।”
আসলাম মিয়া বলেন, উপদেষ্টা থেকে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি এর সদুত্তর না দিয়ে গণমাধ্যমকে প্রকারান্তরে হুমকি দিয়ে নিজের নাগরিত্ব নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছেন। এর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন, কারণ এটা সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
“নাগরিকত্ব নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, আমরা তার আসল সত্য জানতে চাই,” বলেন আসলাম মিয়া।
আইনি নোটিসে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাদের অন্তত নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া যায়।
সংবিধানের ৬৬(১) অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিক এবং ২৫ বছর বয়সী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য।
৬৬(২)(গ)-তে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি দিলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না।
তবে ৬৬(২এ)-তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকত্ব থাকা কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেওয়ার পর দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তাকে ওই অনুচ্ছেদের অধীনে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না।
সংবিধানের ৬৬(৪)-এ বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদের বিধান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীসহ কয়েকটি পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
নোটিসে ড. খলিলুর রহমানের নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থা, তিনি কখনো বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, বিদেশি পাসপোর্ট আছে বা ছিল কি না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তা ত্যাগ করেছেন কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকলে ত্যাগের তারিখ এবং তা গ্রহণের তারিখও জানতে চাওয়া হয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন উল্লেখ করে নোটিশে তার নিয়োগ ও শপথের সময় সাংবিধানিক শর্ত পূরণ হয়েছিল কি না, তাও যাচাই করতে বলা হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নন এমন কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা প্রাসঙ্গিক।
খলিলুর রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নোটিসে তার নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থা, তিনি কখনো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা করেন কি না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তা ত্যাগ করেছেন কি না—এসব তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। তবে খলিলুর রহমান এর আগে প্রকাশ্যেই বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২৫ সালের ২১ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমার একটাই জাতীয়তা, আমি বাংলাদেশি।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, তার কোনো আমেরিকান পাসপোর্ট নেই এবং বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের জাতীয়তা তার নেই।
হুমায়ুন কবির গত ২১ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নোটিসে তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে ওঠা প্রশ্ন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের আগে তিনি ওই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না, করে থাকলে কোন তারিখে করেছেন এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তা কোন তারিখে গ্রহণ করেছে—এসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ২৪ আগস্ট সাংবাদিকরা তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তবে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। তবে পরদিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হওয়ায়ে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
নোটিসে সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদের কথাও বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তৃতীয় তফসিলে উল্লেখিত পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নির্ধারিত শপথ বা ঘোষণা করতে হয়। তৃতীয় তফসিলে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর শপথে বাংলাদেশের প্রতি সত্য বিশ্বাস ও আনুগত্য এবং সংবিধান সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষার অঙ্গীকারের কথা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নোটিসে দুই মন্ত্রীর বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি কোনো শপথ, ঘোষণা বা আনুগত্যের স্বীকৃতি আছে কি না, তাও যাচাই করতে বলা হয়েছে।
আসলাম মিয়া বলেন, “তিনি আসলে নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন কি না, সেটা প্রমাণ করুন। আমরা এর আইনি ব্যাখ্যা চাচ্ছি।”
নোটিসে ২০২৩ সালের একটি রিট মামলার প্রসঙ্গও আনা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়টি ওই মামলায় চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। নোটিসে দাবি করা হয়েছে, ওই মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া তখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় হাই কোর্ট আবেদনটি খারিজ করে।
দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে ওই রিট মামলার নজির সাম্প্রতিক সময়েও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া একটি অভিযোগে সেই মামলার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য শুধু আবেদন করাই যথেষ্ট নয়; ত্যাগের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
নোটিসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই ব্যক্তির নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার নথি, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ত্যাগের নথি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি কোনো শপথ, ঘোষণা বা আনুগত্যের স্বীকৃতি থাকলে তার তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে।
কোনো সাংবিধানিক অযোগ্যতা পাওয়া গেলে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আর অযোগ্যতা না থাকলে তাদের নিয়োগ ও দায়িত্বে বহাল থাকার আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি জানাতে বলা হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, এটি কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তথ্যগত অভিযোগ করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, সাংবিধানিক যোগ্যতা এবং উচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করাই এর উদ্দেশ্য।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইকে-০৬




