জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কুমামোতো প্রিফেকচারে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে এবং অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। খবর রয়টার্সের।
টোকিওতে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ১ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ঠিক কতজন হতাহত হয়েছেন এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে আহত হওয়ার খবর পেয়েছি। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে।
জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের তথ্য অনুযায়ী, একটি হাসপাতালেই ৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে চলন্ত একটি বুলেট ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নিক্কেই সংবাদপত্র।
ভূমিকম্পে একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এনএইচকে জানিয়েছে, একটি এইয়ন শপিংমলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রচারমাধ্যমটির প্রচারিত ফুটেজে বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন লাগা এবং আংশিকভাবে ভবন ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এইয়ন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ভূমিকম্পের ফলে উঁচু সড়কসহ বিভিন্ন মহাসড়কে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। একটি মালবাহী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে এনএইচকে। এ ছাড়া রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং বহু ফ্লাইট বাতিল বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই অঞ্চলে থাকা তাদের কারখানার কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।
নিক্কেইর খবরে বলা হয়েছে, সনি ও ফুজিফিল্মও ওই এলাকার কারখানাগুলো থেকে কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। সনির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেড় লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে, সেখানে অন্তত এক সপ্তাহ শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
ভূমিকম্পের পর সরকার কুমামোতো, নাগাসাকি, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা, ওইতা ও মিয়াজাকি প্রিফেকচারে জরুরি ভূমিকম্প সতর্কতা জারি করে। এসব অঞ্চল জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে অবস্থিত। জাপান আবহাওয়া সংস্থা শুরুতে এক মিটার উচ্চতার সুনামির সতর্কতা জারি করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে।
কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে প্রায় ৪০ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। রেলওয়ে কোম্পানি জেআর কিউশু জানিয়েছে, তাদের সব ধরনের সেবা, এমনকি উচ্চগতির বুলেট ট্রেন চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কুমামোতো বিমানবন্দরও রানওয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন এয়ারলাইনস ফ্লাইট বাতিল বা অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর কেডিডিআই ও ডোকোমো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ট্রান্সমিশন লাইনের ক্ষতির কারণে তাদের মোবাইল সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে।
জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর ওই অঞ্চলের কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অস্বাভাবিকতার খবর পাওয়া যায়নি।
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি জাপান। দেশটিতে গড়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে অন্তত একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা আগ্নেয়গিরি ও গভীর সমুদ্রখাতসমৃদ্ধ ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থান করায় বিশ্বের ৬ দশমিক ০ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্প জাপানেই ঘটে।
উল্লেখ্য, ঠিক ১০ বছর আগে কুমামোতোতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং আরও দুই হাজার ৭৩৯ জন আহত হন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সে সময় হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ক্ষতির শিকার হয়েছিল শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান কুমামোতো দুর্গও।
দুর্গ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবারের ভূমিকম্পেও দুর্গটির পাথরের দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-০৯




