ছবি: সিলেট ভিউ।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া পাথর মহলে জব্দকৃত নিলামের পাথর চুরি এবং অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর রাতের আঁধারে নৌপথে জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম বাজারে পাচার করা হচ্ছে। প্রতিদিন রাতের আঁধারে কোয়ারি এলাকা থেকে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর ইঞ্জিনচালিত স্টিলের ভলগেট ও বারকি নৌকায় করে নিয়ে গিয়ে সেখানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে বৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে জব্দ করে বিভিন্ন স্থানে মজুদ রাখা পাথর এখন চুরির শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি সুরমা ও লোভা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি চক্র নৌ-পথকে ব্যবহার করে কোয়ারির বিভিন্ন এলাকা থেকে জব্দকৃত পাথর সরিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে নতুন করে পাথর উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
সূত্র জানায়, লোভাছড়া পাথর কোয়ারি এলাকার সাউদগ্রাম, বড়গ্রাম, ভালুকমারা ও বাজেখেল মৌজায় মজুদ থাকা জব্দকৃত পাথর রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বাজেখেল গ্রামের আব্দুল্লাহ, ভালুকমারা গ্রামের মুহিব, ডাউকেরগুল গ্রামের সালমানসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রতিরাতে স্টিলের ভলগেট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পাথর পরিবহন করছে। এসব পাথর সুরমা নদী হয়ে জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। সেখানে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ী উত্তর আলী মেম্বার, আব্দুল খালিকসহ একটি সিন্ডিকেট অবৈধভাবে এসব পাথর কিনে নেয়। পরে আটগ্রামে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্রাশার জোনে পাথর ভেঙে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
এদিকে আটগ্রাম বাজারসংলগ্ন জনবহুল এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ক্রাশার জোনকে ঘিরেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আটগ্রাম আমজাদিয়া দাখিল মাদরাসা ও আটগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে অবৈধ ক্রাশার জোনটি গড়ে তুলেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খুব কাছেই ক্রাশার মেশিন পরিচালিত হওয়ায় পরিবেশের পাশাপাশি পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে প্রতিদিন শতাধিক স্টিলের ভলগেট ও বারকি নৌকায় করে পাথর পরিবহন করা হচ্ছে। প্রতিটি ভলগেটে প্রায় এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ঘনফুট পর্যন্ত পাথর বহন করা হয়।
মীম সালমান নামের স্থানীয় একজন জানান, লোভাছড়া কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে পাথর এনে আটগ্রাম বাজারে মজুদ করা হচ্ছে। শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে পাথর বোঝাই একটি স্টিলের ভলগেট থেকে পাথর আনলোডের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানা পুলিশকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে ভিডিওটি সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির কাছে পাঠানো হলে রবিবার জকিগঞ্জ থানা পুলিশ আটগ্রাম বাজারে গিয়ে পাথরের স্তূপ পরিদর্শন করে।
স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, লোভাছড়া পাথর কোয়ারি থেকে জব্দকৃত সরকারি পাথর নিয়মিত পাচার হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সরকারি বিপুল পরিমাণ সম্পদ প্রতিনিয়ত চুরির শিকার হচ্ছে। মাসখানেক আগে জকিগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আটগ্রাম বাজারের অবৈধ ক্রাশার জোনে অভিযান চালিয়ে উস্তার আলী মেম্বারসহ দুই পাথর ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন। তবে এরপরও অবৈধভাবে পাথর ব্যবসা ও ক্রাশার পরিচালনা বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় অনেকেই জানিয়েছেন, আটগ্রাম বাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার পাথর কেনা-বেচা করা হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে আটগ্রামে ক্রাশার জোনসহ পাথর ক্রয়-বিক্রয় হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
এদিকে গত ৯ জুলাই সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে মের্সাস পিয়াস এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বিএমডির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি লোভাছড়া পাথর মহলের নিলাম পেয়ে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ কার্যাদেশ লাভ করে। পরে পাথর অপসারণের সময়সীমা নিয়ে আদালতে গেলে হাইকোর্ট সময় বৃদ্ধির আদেশ দেন। তবে বিষয়টি বর্তমানে রিট নং-১২২০৫/২০২৫ হিসেবে হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি ও কুচক্রী মহল নিলামকৃত পাথরের স্তূপ থেকে দিন-রাত ব্যাপক হারে পাথর চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। চুরি হওয়া পাথর লোভা ও সুরমা নদীপথে পরিবহন করে চিন্তার বাজার, লক্ষ্মীপ্রসাদ, ডাউকেরগুল, লোভার মুখ বাজার, আন্দুর মুখ বাজার, সুরইঘাট বাজার, আটগ্রাম বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে বিক্রি করা হচ্ছে।
পিয়াস এন্টারপ্রাইজ জানায়, এভাবে ধারাবাহিকভাবে পাথর চুরি চলতে থাকলে অচিরেই নিলামকৃত পাথরের মজুদ শেষ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ পাথর চুরি হয়ে গেছে, যার ফলে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং একই সঙ্গে সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসকের কাছে তিনি সরকারি সম্পদ ও রাজস্ব রক্ষার স্বার্থে লোভাছড়া পাথর মহলের জব্দকৃত নিলামের পাথর চুরি বন্ধে জরুরি ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
কানাইঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাপস চক্রবর্তী তুষার সিলেট ভিউকে বলেন, ‘কানাইঘাট লোভাছড়া কোয়ারি এলাকা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও জব্দকৃত পাথর চুরি রোধে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত পাথর উত্তোলন বন্ধ, ক্রাশার মেশিন জব্দ এবং বারকী নৌকা জব্দ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি পাথরও উদ্ধার করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাথর পাচার বন্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’
অন্যদিকে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজিত কুমার চন্দ সিলেটভিউকে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ দেয় নি। তাই বিষয়টি আমাদের নলেজে নেই। তবে আপনার কাছ থেকে শুনেছি, যদি এই ঘটনার সাথে কেউ জড়িত থাকে কিংবা এই রকমের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে তাহলে আমরা শীগ্রই এই ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের মার্চ মাসে লোভাছড়া পাথর কোয়ারির লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তর কোয়ারিতে উত্তোলিত ১ কোটি ৫ লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করে। এর মধ্যে গত বছর ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর নিলামের মাধ্যমে পিয়াস এন্টারপ্রাইজের কাছে বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট জব্দকৃত পাথর কোয়ারি এলাকায় মজুদ থাকলেও বর্তমানে সেগুলোই চুরির শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৯




