ছবি: সংগৃহিত
একসময় শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক সৌহার্দ্যের জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল সিলেটের কানাইঘাট উপজেলা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রে উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত তিন মাসে (মে-জুলাই ২০২৬) উপজেলায় খুন, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু ও অন্যান্য দুর্ঘটনাসহ অস্বাভাবিক ঘটনায় অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে বিদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন উপজেলার ছয় প্রবাসী। ধারাবাহিক এসব মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের পাশাপাশি উদ্বেগ বেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৮ মে স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরার সময় উপজেলার একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অভি দাসকে একটি পানিবাহী ব্যাটারিচালিত ভ্যান চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১২ জুন উপজেলার সদর ইউনিয়নের নিজ চাউরা পশ্চিম গ্রামে পানিতে ডুবে একসঙ্গে প্রাণ হারায় দুই শিশু। তারা হলো আলী আহমদের চার বছর বয়সী কন্যা আনিসা বেগম এবং তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নি ফারিয়া বেগম। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
২১ জুন কাতারের আল শাহানিয়া এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসীর মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। নিহতরা হলেন ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের মাঝতালুক গ্রামের মোস্তাক আহমদ (৩০) ও জুবায়ের আহমদ (৩০), আগতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন (৩০), আমরপুর গ্রামের জিবাল আহমদ (৩৬) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের গাছবাড়ি নয়াগ্রামের কাদির আহমদ (২৪)। ৩০ জুন তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে আকুনি মাদ্রাসা মাঠে একসঙ্গে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিজ নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয় পাঁচ রেমিট্যান্সযোদ্ধাকে।
এরই মধ্যে ২৮ জুন পৌর শহরের উপজেলা রোডের একটি ওয়ার্কশপে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে স্ক্রু-ড্রাইভারের আঘাতে গুরুতর আহত হয় কিশোর আহাদ আহমদ (১৬)। পরে ২৯ জুন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১ জুলাই লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের করুনা সুন্দরী দীঘীর পাশে ভায়রা ভাই ও স্বজনদের হামলায় নিহত হন বড়বন্দ ৩য় খণ্ড গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (২৮)। কাতারের দুর্ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বড়চতুল ইউনিয়নের মুক্তাপুর গ্রামের তারেক আহমদ (২৪)। ফলে তিন মাসে বিদেশেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কানাইঘাটের ছয় প্রবাসী। ৭ জুলাই সুরমা নদীর চান্দের বাজার এলাকা থেকে নিখোঁজের দুই দিন পর মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক ইকবাল হুসেনের (১৯) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের নিজ রাজাগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা। ১০ জুলাই দিঘীরপার পূর্ব ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও এর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ১২ জুলাই নয়াগাঁও উজানিপাড়া গ্রামে এবাদুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা-তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ২৪ জুলাই গাছবাড়ী উত্তর বাজারে ঢাকনাবিহীন সেপটিক ট্যাংকে পড়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আহবাফ হুমাইদি ইসরানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সবশেষ ২৬ জুলাই লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের মিকিরপাড়া গ্রামে একটি গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় সৈয়দ আহমদ (শারীফ) (২২)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি নিয়েও তদন্ত চলছে।
বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে কানাইঘাটে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শুধু চলতি জুলাই মাসেই তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা জনমনে নতুন করে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডও সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
শাহবাগ জামেয়া মাদানিয়া ক্বাসিমুল উলূম মাদরাসার সহকারী শিক্ষক মুফতি মাওলানা ইবাদুর রহমান বলেন, "ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ ও অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। মানুষ যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখনই আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এমন পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা সম্ভব।"
কানাইঘাটের সন্তান সাংবাদিক ও গবেষক এহসানুল হক জসীম বলেন, "সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাইঘাটের মতো ধর্মপ্রাণ জনপদে হত্যাকাণ্ড ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ার পেছনে মূল কারণ দুটি। প্রথমত: সমাজে সার্বিক নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। আলেম-উলামাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও অপরাধবিরোধী সামাজিক বার্তার যথাযথ প্রচার হলে প্রকৃত ধর্মচর্চার সুফল মিলবে এবং এই জাতীয় ঘটনা কমে আসবে।
দ্বিতীয়ত: অনেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে দায়ী করলেও কানাইঘাটের মতো জনপদে মূলত বাদী ও বিবাদীপক্ষের অপ্রকাশ্য সমঝোতার কারণেই আসামিরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধীরা পার পাচ্ছে। মামলা চলাকালে বিচারবহির্ভূত গোপন সমঝোতা বন্ধ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে কানাইঘাটে হত্যাকাণ্ড ও অপমৃত্যু অনেক কমে আসবে।"
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. মহি উদ্দিন বলেন, "বিষণ্নতা, হতাশা ও একাকীত্ব মানুষকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হতে হবে।"
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, ধারাবাহিক এসব অস্বাভাবিক মৃত্যু শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক বন্ধন এবং জনসচেতনতার বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা ও সমাজের সচেতন মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/মাহবুব/ইকে




