ছবি: সিলেট ভিউ।

শেষ বয়সে পরিবার নিয়ে শান্তিতে কাটাবেন- এই স্বপ্নে মনের মতো করে সাজিয়েছিলেন ‘নিকুঞ্জ ভিলা’। বাহারি ফুল আর নানা জাতের গাছ-গাছালিতে ঘেরা সেই বাড়িটিই ছিল মো. আব্দুস সাত্তারের আপন ঠিকানা, শান্তির আশ্রয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের হাতে সাজানো সেই নিকুঞ্জ ভিলাতেই থেমে গেল স্ব-স্ত্রীক তাঁর জীবনের পথচলা। অপ্রত্যাশিত এক হত্যাকাণ্ডে স্ত্রীসহ নির্মমভাবে খুন হন আব্দুস সাত্তার।  এসময় তাঁর বাসার গৃহকর্মীকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ফলে যে নিকুঞ্জে ছিল স্বপ্ন আর শান্তির আবাস, সেই নিকুঞ্জেই এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

 


ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে মহানগীর কোতোয়ালী থানাধীন রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায়। 

 

নিহতরা হলেন- বিয়ানীবাজার আখাখাজনা এলাকার মৃত আবরু মিয়ার ছেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।

 

জানা গেছে, বুধবার (১২ আগস্ট) হঠাৎকরে সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মহানগীর রায়নগর এলাকায় মো. আব্দুস সাত্তার বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। বাসায় অসুস্থ কেউ চিৎকার করছেন ভেবে কেউ আর এগিয়ে যাননি। সকাল ১০টার দিকে বাসার রঙের কাজের জন্য একজন মিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করেও সাড়াশব্দ পায়নি। এসময় পাশের বিল্ডিংয়ের দু’তলার এক ভাড়াটে দেখতে পান আব্দুস সাত্তারের বাসার দরজার নিচ দিয়ে বারান্দায় রক্ত গড়িয়ে বেরুচ্ছে। এসময় তারা দ্রুত চিৎকার-চেচামেচি করলে আশপাশের আরও লোকজন জড়ো হন। পরবর্তীতে থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে আনুমানিক পৌনে ৫টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে প্রেরণ করা হয়।

 

এই ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই দিন বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে (৪ ঘন্টার ভেতরে) অভিযান দিয়ে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা এবং মৃত নূর মিয়া (কবিরাজ) ছেলে বাবুল মিয়া (৪০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন তিনি।

 

বাবুল মিয়া গ্রেফতার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে বলেন, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় ভয়াবহ ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত একটি বিশেষ টিম গঠন করে। প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়। পরে বিকেল ৩টার দিকে রায়নগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

 

তিনি জানান, বুধবার (১২ আগস্ট) বাবুল মিয়া একটি ছুরি নিয়ে ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল মিয়া ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। এ সময় সুরাইয়া এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। পুলিশের গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। 

 

পুলিশ কমিশনার জানান, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া বাবুল তার বাড়ি চাঁদপুর বলে জানিয়েছে। তবে তার দেওয়া তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঠিকানা নিশ্চিত করা হবে।


জানা যায়, মো. আব্দুস সাত্তারের গ্রামের বাড়ি বিয়ানীবাজার এলাকার আখাখাজনায়। রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত তিনি। আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়াও মিতালী আবাসিক এলাকায় তাঁর পাশাপাশি তিনতলা দুটি বাসা রয়েছে। তার মধ্যে ১১১ নম্বরের ৩য় তলাবিশিষ্ট নিজস্ব বাসায় বসবাস করতেন। উপরের তলা ও নিচতলায় ভাড়াটিয়ারা থাকতেন এবং তিনি দ্বিতীয় তলায় থাকেন। মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারর সাথে বাসায় বসবাস করতেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। দুই বিল্ডিংয়ের বাকি ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়াটিয়ারা থাকতেন। আব্দুস সাত্তারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ও দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। সাত্তার মিয়া বয়স্ক লোক হওয়ায় তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্তও বলে জানা যায়। 

 

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-১১