নিজস্ব প্রতিবেদক, বড়লেখা:: মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মিরারপাতন গ্রামের মেসার্স এস.আর ব্রিকসের (মেসার্স সুরমা ব্রিকস) পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ইটভাটাটির ইট পোড়ানোর লাইসেন্স বাতিল করে কার্যক্রম বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিবেশগত ছাড়পত্র বিষয়ক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্প্রতি সিলেটের পরিবেশ অধিদপ্তরের সুরমা সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ।
সভায় কমিটির সদস্যদের কাছে বিভিন্ন জেলা কার্যালয় থেকে পাওয়া পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্রসংক্রান্ত প্রস্তাব ও নথি উপস্থাপন করা হয়। পরে এসব নথির কারিগরি ও আইনগত বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়, মেসার্স এস.আর ব্রিকসের বিষয়ে জেলা কার্যালয় থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইটভাটাটি থেকে প্রায় ৩৫০ মিটার দূরে রাঙ্গাউটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। এ কারণে ইটভাটাটির অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দেয় পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়।
পরে ইটভাটাটির অনুকূলে আগে দেওয়া পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের সুপারিশ বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়। বিষয়টি পরিবেশগত ছাড়পত্র বিষয়ক কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হলে কমিটির সদস্যরা তা পর্যালোচনা করেন।
কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)-এর ধারা ৮(৩) ও (৪) অনুযায়ী ইটভাটাটি নিষিদ্ধ এলাকায় অবস্থিত। এ কারণে জেলা কার্যালয়ের পাঠানো সুপারিশ কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং ইটভাটাটির অনুকূলে আগে জারি করা পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয় থেকে উদ্যোক্তাকে ইটভাটার অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকার জন্য চিঠি দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে ইট পোড়ানোর লাইসেন্স বাতিলের জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে, গত ১৫ মার্চ বড়লেখা সদর ইউনিয়নের রাঙ্গাউটি এলাকার বাসিন্দা সুলতান আহমদসহ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কাছে মিরারপাতন গ্রামের মেসার্স এস.আর ব্রিকসের মাটি কাটার ও ইটভাটার লাইসেন্স বাতিল করে ভাটা বন্ধের আবেদন করেন।
অর্ধশতাধিক লোকজনের স্বাক্ষরিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বড়লেখা সদর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মিরারপাতন গ্রামে প্রায় ১০ বছর আগে স্থাপিত ইটভাটাটি বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে এস.আর ব্রিকস নামে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভাটার মালিকপক্ষ পরিবেশ ও সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইটভাটায় কয়লার পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে বড়লেখার সংরক্ষিত বনাঞ্চল পাথারিয়া পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে গাছ কেটে ইট পোড়ানো হচ্ছে। যার ফলে নির্গত কালো ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। একইসঙ্গে রাতের বেলায় অবৈধভাবে মাটি কাটা, কৃষিজমির টপ সয়েল উত্তোলন এবং ইট তৈরির কাজে ব্যবহারের কারণে এলাকার কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভিযোগে বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী লোকালয়, জনবসতি, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় স্থাপনার কাছাকাছি ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও, মিরারপাতনের লোকালয়ের মধ্যে ভাটাটি স্থাপিত হয়েছে। ভাটার ১শ’ ফুটের মধ্যে বসতবাড়ি এবং ২শ’ মিটারের মধ্যে একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ চারটি মসজিদ রয়েছে। ভাটার মালিকপক্ষ অবৈধভাবে ষাটমা ছড়া খালের আইলাপুর অংশে মাটি কেটে খাল ভরাট করে এবং খালের উপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে ইটভাটার মাটি পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে। এতে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে খালের পানি লোকালয় ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করে ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে শত শত মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া সরকারি ও গ্রামীণ সড়কে ইট, কাঁচামাল ও মাটি মজুদ এবং ট্রাক্টর দিয়ে অবাধ পরিবহনের কারণে রাস্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ব্রিকস ফিল্ড সংলগ্ন সড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া নিয়মিত ধুলাবালি ও যানবাহনের চলাচলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। ভাটার বর্জ্য ও অবশিষ্ট পদার্থ পাশ্ববর্তী খাল ও কৃষিজমিতে উন্মুক্তভাবে ফেলা হচ্ছে। যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে। এছাড়া ভাটার উত্তর পাশে থাকা সরকারি খাল (উদই ছড়া) বিভিন্ন প্রকার বর্জ্য, মাটি ও কয়লা দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মালিকপক্ষ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে এস.আর ব্রিকসের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ, লাইসেন্স বাতিল এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখা থেকে গত ১৫ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চিঠিতে বলা হয়, বড়লেখা উপজেলার ৬ নম্বর বড়লেখা সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মিরারপাতন গ্রামে অবস্থিত মেসার্স এস.আর ব্রিকসের মাটি কাটা ও লাইসেন্স বাতিল করে ইটভাটা বন্ধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আবেদনটি পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম জানিয়েছেন, মেসার্স এস.আর ব্রিকস নামের ইটভাটার লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/লাভলু




