প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শনিবার বিশ্বজুড়ে এই দিবসে পালিত হয় | 

জরুরী পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সঠিকভাবে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য |


 ​স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল এবং এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার | একটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি শুধু শহরের আধুনিক ও দামি হাসপাতাল কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে না  বরং এর শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় তৃণমূল পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর |
​বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ গ্রাম ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করে, সেখানে জটিল চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া অনেক সময়ই কঠিন ও ব্যয়বহুল | এসব এলাকায় যেকোনো দুর্ঘটনা, হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা মা ও শিশুর জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে জীবনরক্ষাকারী প্রথম প্রাচীর হিসেবে কাজ করেন প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক (Primary Healthcare Provider) |

 প্রথম মুহূর্তে সঠিক সেবা দিয়ে তারা হাজারো মানুষের জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে দেন |

​২. প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক কে ? (Who is a Primary Healthcare Provider ? )
​প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক হলেন মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষিত এমন একজন সেবাদানকারী, যিনি সাধারণ মানুষকে জরুরি প্রথম চিকিৎসা দেন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ান এবং জটিল রোগীদের দ্রুত উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন |
​তারা সরকার, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (NGO) এবং স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন |


​জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা ও সাড়াদান (First Aid and Emergency Response) : যেকোনো দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুস্থতায় তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী সেবা প্রদান |
​এসএমসি ব্লু স্টার নেটওয়ার্ক (SMC Blue Star Network) : পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য, ওভার দ্য-কাউন্টার (OTC) ওষুধ এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরামর্শ দান |
​বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান / শিশু পল্লী প্লাস (Specialized Foundations / Shishu Polli Plus) : গর্ভকালীন পরিচর্যা (ANC), প্রসবোত্তর সেবা (PNC), নবজাতকের যত্ন এবং শিশুর সঠিক পুষ্টি বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োগ |

​৩. প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকের মূল গুরুত্ব (The Critical Importance)
​মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকদের ভূমিকা অপরিসীম :
​ক. স্বর্ণালী মুহূর্ত ও তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষা (The Golden Hour and Immediate Life Saving Interventions)
​চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেকোনো দুর্ঘটনার পর প্রথম ৬০ মিনিটকে 'গোল্ডেন আওয়ার' বা স্বর্ণালী মুহূর্ত বলা হয় | এই সময়ের সঠিক সেবাই রোগীর প্রাণ বাঁচায় |
​আঘাত ও রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ (Traumatic Injury & Bleeding Control) : অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যান্ডেজ করা এবং সঠিক অবস্থানে রেখে রোগীকে শকমুক্ত রাখা |
​সিপিআর বা কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস (CPR  Cardiopulmonary Resuscitation) : হার্ট অ্যাটাক বা পানিতে ডোবার ক্ষেত্রে দ্রুত কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ও বুকে চাপ দিয়ে হৃদস্পন্দন চালু রাখার চেষ্টা করা |

​পোড়া রোগীর প্রাথমিক সেবা (Burn Management) : আগুনে পোড়া স্থানে বরফ বা ডিম না দিয়ে টানা ১৫-২০ মিনিট সাধারণ পরিষ্কার পানি ঢালা |
​সাপে কাটা রোগীর সঠিক ব্যবস্থাপনা (Snakebite Management) : কুসংস্কার বা ওঝার কাছে না গিয়ে রোগীকে শান্ত রেখে এবং হাত-পা শক্ত করে না বেঁধে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা |
​খ. মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসকরণ (Reduction of Maternal and Child Mortality)
​সুস্থ মা ও শিশু একটি দেশের সুস্থ ভবিষ্যতের প্রতীক | মাঠপর্যায়ের সেবাদানকারীরা এই সুরক্ষায় মূল ভূমিকা রাখেন |

​গর্ভকালীন পরিচর্যা (Antenatal Care  ANC) : গর্ভাবস্থায় অন্তত ৪ বার প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করা, রক্তচাপ মাপা এবং আয়রন-ফলিক অ্যাসিড বড়ি সরবরাহ করা |

​গর্ভকালীন বিপদচিহ্ন শনাক্তকরণ (Identification of Danger Signs) : গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রক্তস্রাব, খিঁচুনি, তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা বা অতিরিক্ত পেটে ব্যথার মতো বিপদচিহ্নগুলো আগেই শনাক্ত করে হাসপাতালে পাঠানো |

​নিরাপদ প্রসব ও প্রসবোত্তর পরিচর্যা (Postnatal Care  PNC) : জীবাণুমুক্ত উপায়ে প্রসব করানো এবং প্রসবের পর মা ও নবজাতকের সংক্রমণ প্রতিরোধে অন্তত ৪ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা |
​শিশুর পুষ্টি ও টিকাদান (Infant Nutrition and Immunization) : জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ দেওয়া, প্রথম ৬ মাস কেবল মায়ের বুকের দুধ (Exclusive Breastfeeding) দেওয়া এবং সরকারি ইপিআই (EPI) টিকা সময়মতো নিশ্চিত করা |

​গ. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি (Healthcare Access for Marginalized Communities)
​গ্রাম বা দুর্গম এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া বেশ ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য | প্রাথমিক চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করেন |

​ঘ. কুসংস্কার দূরীকরণ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা (Eradication of Superstitions and Public Health Education)
​আমাদের সমাজে এখনো অনেক ক্ষতিকর কুসংস্কার ও কবিরাজি চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে | প্রাথমিক চিকিৎসকরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করেন এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন |
​ঙ. কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা পরিচালনা (Streamlining the Referral System)
​রোগীর শারীরিক অবস্থা জটিল হলে ধরে না রেখে দ্রুত ভালো হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠানোর সঠিক সিদ্ধান্ত নেন একজন প্রাথমিক চিকিৎসক |
​চ. সাশ্রয়ী ও ব্যয়সংকোচনকারী স্বাস্থ্যসেবা (Affordable and Cost Effective Healthcare)
​সামান্য শারীরিক সমস্যায় সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রাথমিক ওষুধ দিয়ে তারা সাধারণ মানুষের অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যয় অনেক কমিয়ে দেন |
​ছ. পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য (Family Planning and Reproductive Health Rights)
​এসএমসি ব্লু স্টার সেবাদানকারীরা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জন্মনিয়ন্ত্রণের আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতি সম্পর্কিত সঠিক পরামর্শ দিয়ে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাত রোধ করেন |
​৪. সামাজিক প্রভাব ও মানবিক দিক (Social Impact and the Human Element)
​চিকিৎসাসেবার বাইরেও একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক সমাজের একজন গভীর আস্থাভাজন স্বাস্থ্য অভিভাবক | রাতে দিনে যেকোনো বিপদে গ্রামের মানুষ সবার আগে তাদের কাছেই ছুটে যান | তাদের মিষ্টি ব্যবহার, সমবেদনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত রোগীকে মানসিকভাবে শক্তি জোগায় |
​৫. চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা (Challenges Facing Frontline Providers)
​তৃণমূল পর্যায়ে এতো বড় ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও তারা কিছু সমস্যার মুখোমুখি হন :
​সম্পদের সীমাবদ্ধতা (Resource Constraints): প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আধুনিক প্রাথমিক চিকিৎসা কিটের অভাব |
​আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব (Lack of Formal Recognition) : স্বাস্থ্য খাতে তাদের অসামান্য অবদানের উপযুক্ত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের অভাব |
​নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন (Need for Continuous Training) : চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন তথ্য ও দক্ষতার সাথে যুক্ত থাকতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত |
​৬. ভবিষ্যৎ করণীয় ও দিকনির্দেশনা (Key Recommendations)
​তৃণমূলের সেবা আরও শক্তিশালী করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
১. নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধি (Regular Capacity Building) : সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত রিফ্রেশার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা।
২. সরঞ্জাম সহায়তা (Logistical Support) : প্রতিটি সেবাদানকারীকে আধুনিক ফার্স্ট এইড বক্স, প্রেশার মাপার যন্ত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া |
3. 
৩. মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ (Formal Integration) : জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ধারায় প্রাথমিক চিকিৎসকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করা |


​ প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকরা হলেন জনস্বাস্থ্যের নীরব নায়ক | বড় বড় হাসপাতালের প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, বিপদের প্রথম মুহূর্তে একজন প্রশিক্ষিত প্রাথমিক চিকিৎসকের সেবা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই একটি অমূল্য প্রাণ বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে | তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও উপযুক্ত মূল্যায়ন একটি সুস্থ ও সুরক্ষিত সমাজ গড়ার চাবিকাঠি |
 


লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, এমপিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য), বি ফার্মা | বাংলাদেশ  ফার্মেসি কাউন্সিল, এসএমসি'র ব্লুস্টার স্বাস্থ্য সেবা দানকারী।