ছবি : এ আই দিয়ে তৈরি প্রতীকী
বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান সুমন মৈত্র। দুইবছর আগে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। তাকে ঘিরেই ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারটির সকল স্বপ্ন। এই সময়ের মধ্যে চাকরির জন্য সুমন চেষ্টা করেছে অনেক জায়গায়। কোথাও মিলেনি চাকরি। ধীরে ধীরে হতাশা ঘিরে ধরে তাকে। ‘সটকার্টে’ বেশি রোজগারের আশায় বন্ধুদের পাল্লায় একদিন ডাউনলোড দেন অনলাইন জুয়ার একটি অ্যাপস। উত্থান-পতনের সর্বনাশা জুয়ায় সুমন এখন ঘরছাড়া। তার সাথে ‘ঘরছাড়া’ মধ্যবিত্ত পরিবারটির স্বপ্ন। নিভে গেছে মিঠুন ও তার পরিবারের সম্ভাবনার সকল প্রদীপ।
সুমনের ভাষ্য, ‘গ্র্যাজুয়েশনের পর অনেক চেষ্টা করেছি। ভেবেছিলাম ভাল চাকরি পেলে সংসারের দায়িত্ব থেকে বাবাকে অবসর দেব। কিন্তু ব্যর্থ হই। বন্ধুরা বললো অনলাইনে জুয়া খেললে দ্রুত টাকা বানানো যায়। ফেসবুকেও এমন বিজ্ঞাপন দেখেছি। হতাশা থেকে একদিন অ্যাপস ডাউনলোড দেই। অ্যাপসের দেওয়া বোনাস দিয়ে জুয়ার জগতে যাত্রা। ছোট ছোট কিছু ব্যাট জিতলাম। আগ্রহ বাড়তে থাকলে। এরপর হারতে হারতে শুরু হল ঋণ করা। ঋণের পরিমাণ দাঁড়ালো প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সম্মান বাঁচাতে বাবার শিক্ষকতার পেনশন, মায়ের স্বর্ণালঙ্কার সব বিক্রি করে দিয়েছেন। সেই লজ্জায় এখন আর বাড়ি যাই না। বাবা-মাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন।’
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সুমনের মতো একই অবস্থা আম্বরখানার হোসেন আহমদের। একসময় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা খুঁইয়ে এখন তিনি অন্যের দোকানের কর্মচারী।
সুমন ও হোসেনের মতো সিলেটের অসংখ্য তরুণ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে সর্বস্বান্ত। সবকিছু খুইয়ে ঋণের চাপে কেউ বাড়িছাড়া, আবার কেউ বেছে নিচ্ছেন মৃত্যুর পথ। জুয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে, এমনকি বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটছে।
গত ২৭ আগস্ট নগরের শিবগঞ্জে বাসার ভেতর থেকে তুহিন মিয়া নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। তাঁর স্ত্রীর দাবি অনলাইন জুয়ার আসক্তি থেকে তুহিন আত্মহত্যা করেছে। জুয়া খেলা নিয়ে তাঁর সাথে প্রায়ই তুহিনের ঝগড়া হতো।
জুয়ায় আসক্ত কয়েকজন যুবকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ফেসবুকে জুয়ার বিজ্ঞাপন দেখে ও বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়েই বেশিরভাগ এই পথে পা বাড়ান। শুরুতে জুয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ছোট ব্যাটে জিতিয়ে দেয়। এতে বাড়তে থাকে আসক্তি। এরপর শুরু হয় খোয়ানোর পালা। তখন আসক্তি থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে যায়। হঠাৎ করে কেউ জুয়া খেলা বন্ধ করে দিলে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে এজেন্টরা ফোন ও ম্যাসেজ পাঠিয়ে পুণরায় খেলতে উৎসাহিত করতো।
অনলাইন জুয়ার কয়েকজন এজেন্টের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, জুয়াড়িদের কাছে জয়া নাইন, সিকে থ্রিপল নাইন, সিভি থ্রিপল সিক্স, ওয়ান এক্স ব্যাট, মেলভেট জুয়ার অ্যাপস বেশি জনপ্রিয়। এসব অ্যাপস দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। জয়া নাইন ও ওয়ান এক্স ব্যাট অ্যাপস পরিচালনা করা হয় মালয়েশিয়া থেকে। অ্যাপসভেদে এজেন্টদের ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হয়।
অনলাইন জুয়ায় তরুণদের আসক্তির কারণ প্রসঙ্গে শাবিপ্রবির কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মোছা. ফজিলাতুন নেছা জানান, হতাশা, কৌতুহল, সর্টকাটে ও কমসময়ে বেশি টাকা রোজগারের লোভে অনেকেই এ পথে পা বাড়ায়। এরপর আসক্তি তৈরি হয়। এবার পাইনি, পরেরবার জিতব- এমন আশায় তারা এই জালে জড়িয়ে যায়। এই ব্যাধি থেকে যুব সমাজকে মুক্ত করতে রাষ্ট্রীয় পলিসি অ্যাপ্লাইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ডিবি-সিটি এন্ড সিসি) সাহাদত হোসেন জানান, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন এজেন্টকে ধরা হয়েছে। আগে শাস্তির বিধান কম থাকায় জুয়াড়িরা সহজে বের হয়ে আসতো। এখন আইন অনেক শক্ত হয়েছে।
সাইবার আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজ উদ্দীন জানান, আগের সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৬ সালে সাইবার সুরক্ষা আইন হিসেবে পাশ হয়েছে। এই আইনে সাইবার স্পেসে জুয়া খেলা, জুয়ার আয়োজন করা, সহায়তা করা, উৎসাহ দেওয়া, প্রচারণা চালানোসহ কোনভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ দুইবছরের দণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ




