টিলাভূমি হিসেবেই পরিচিত সিলেট। একসময় জেলাজুড়ে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড় ও টিলা। সমতলের উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজঘেরা টিলাগুলোই ছিল সিলেটের ঐতিহ্য। এই টিলার উপর ভিত করেই দাঁড়িয়েছিল সিলেটের প্রাকৃতিক নৈসর্গ। কিন্তু বহু বছর ধরে চলে আসছে এই টিলার ‘মুণ্ডুপাত’। ভূমিখেকো প্রভাবশালী ‘তস্কররা’ একে একে কেটে সমতল করেছেন অনেক টিলা।


 টিলার অস্তিত্ব বিলিন করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসন। এখনো চলছে সেই ধারা। গেল দেড় দশকে সিলেটের প্রায় অর্ধেক টিলা গিলেছে এই চক্র। পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসের এই যজ্ঞে অনেকটা নিরব দর্শক প্রশাসন। দিনের আলোতে মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও রাতের আঁধারে ‘সমঝোতায়’ চলে পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড। 



সিলেট মহানগরীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিলা ছিল বালুচর এলাকায়। বালুচর এখন বৃহৎ আবাসিক এলাকা। সারি সারি টিলা কেটে নির্মিত হয়েছে অট্টালিকার পর অট্টালিকা। টিলা কেটে ওই এলাকায় শুধু আবাসন নয়, সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নগরের টিলাবহুল আরেক এলাকা সিটি করপোরেশনের ৮ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড। তারাপুর ও আলীবাহার চা বাগানের পাদদেশের এই ওয়ার্ড দুটিতে ছিল অসংখ্য টিলা। এখন টিলা কেটে গড়ে ওঠেছে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা। সিলেট শহরতলীর বাইশটিলা এলাকায়ও একসময় ছিল সুউচ্চ টিলা। এখন সেই টিলাগুলো কেটে তৈরি করা হয়েছে আবাসন। 


সরেজমিনে করেরপাড়া, হাওলাদারপাড়া, দুসকি ও মোহাম্মদী আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে নানা কৌশলে চলছে টিলা কাটা। করেরপাড়ার বিশাল একটি টিলার একপাশ কেটে আবাসনের জন্য প্লট তৈরি করা হয়েছে। সুউচ্চ টিলার ওপর প্রান্তে চলছে একটি সংগঠনের নামে টিলা কাটা। আলীবাহার চা বাগান ও মোহাম্মদী আবাসিক এলাকার মধ্যবর্তী  সড়কের পাশে দেখা গেছে টিন দিয়ে বেড়া দিয়ে ভেতরে চলছে টিলা কর্তন। পাশে শোভা পাচ্ছে টিলা কাটার শাস্তি উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের বসানো সাইনবোর্ড। এর অনতিদূরে আরেকটি বাসার পেছনের বিশাল টিলা কেটে সাবাড় করে দেওয়ারও প্রমাণ মিলে সরেজমিনে। মহানগরী ছাড়াও জেলার সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় অনেক টিলা ছিল। দিনে দিনে সেগুলো সংকুচিত হয়ে এসেছে। 


পরিবেশ আইনবীদ সমিতির (বেলা) দায়েরকৃত রিটের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিলেটের টিলার একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়। পরিসংখ্যান মতে, সিলেট সদর ও নগরে ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে ১টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি, জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলা, এবং কানাইঘাটে ১ হাজার ৬৬০ দশমিক ৬২ একর ও ফেঞ্চুগঞ্জে ২৫১ দশমিক ০৮ একর টিলা ছিল। দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বেশ কয়েকটি টিলা থাকলেও প্রশাসনের প্রতিবেদনে সে তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বেলা জানায়, সিলেটে জেলার ৬টি উপজেলা ও মহানগরীর টিলা কাটা রোধ এবং সংরক্ষণ নিয়ে আদালতে মামলা হয়। মামলাভূক্ত ওই এলাকায় ২০০৯ সালে ১০২৫টি টিলা ছিল। কিন্তু বর্তমানে টিলার সংখ্যা নেমেছে অর্ধেকে। বর্তমানে ওই উপজেলাগুলোতে কোনরকম অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে ৫৬৫টি টিলা। অর্ধাৎ প্রায় দেড় দশকে অর্ধেকের বেশি টিলা ভূমিখেকোরা সাবাড় করে দিয়েছে। 


বেলা সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার জানান, পাহাড়/টিলা কর্তন/মোচনরোধে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা প্রতিপালনে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যমান পাহাড়-টিলা কর্তনরোধে রিট পিটিশন (নং- ৯৭৫০/২০১১) দায়ের করা হয়। এর প্রেক্ষিতে উচ্চআদালত ২০১২ সালের ১ মার্চ পাহাড়-টিলা কাটার সাথে জড়িতদের শাস্তি প্রদান; বিদ্যমান দখলদার উচ্ছেদ ও অবশিষ্ট পাহাড়/টিলা রক্ষা, পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। ওই আদেশে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতেও নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সেই আদেশ পুরেপুরি প্রতিপালন করেননি। যে কারণে টিলা কাটা বন্ধ হচ্ছে না। 


তিনি আরও জানান, সিলেটে এখনো যেসব টিলা অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো রক্ষায় এখনই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। মামলাভূক্ত ও ঝুকিপূর্ণ টিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড টানানো প্রয়োজন। টিলা ধ্বংসের জন্য প্রশাসনের নির্লিপ্ততাকে দায়ি করে তিনি বলেন, একসময় সিলেটে টিলাকাটার মচ্ছব চললেও প্রশাসনের পক্ষ আদালতের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।  ইতোমধ্যে যেসব টিলা কাটা হয়েছে সেগুলোর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।


সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ