ছবি: সংগৃহিত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় ইউনিয়ন পরিষদে সম্ভাব্য প্রার্থী কারা, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী, জনপ্রিয়তা কেমন এবং মামলা রয়েছে কি না, এই ধরনের অন্তত ২১টি তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে থানা পুলিশের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পুলিশ ও বিভিন্ন এলাকার সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী সূত্রে এই তথ্য মিলেছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার আটটি জেলার পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে কোনো নির্বাচনের সময়েই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নানা তথ্য নিয়ে তালিকা তৈরি করা হয়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখেও সেই তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা একাধিক থানার ওসি কালবেলাকে জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার নির্দেশে নির্ধারিত ছকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নানা তথ্য নেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য ফরম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য নেওয়া শেষ হলে তা পুলিশের পলিটিক্যালি এক্সপোসড পার্সন বা পিইপি সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হবে। সাধারণত উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পূর্ণ নাম (ডাক নামসহ), পিতার নাম, মায়ের নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, জন্ম তারিখ, পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে), ইমেইল নম্বর (যদি থাকে), প্রার্থীর পেশা, মোবাইল নম্বর, নিকটতম সহযোগীর মোবাইল নম্বর, সহযোগীর নাম (পিএস/এপিএস বা রাজনৈতিক সহযোগী) এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, ডিগ্রি, পাসের সাল, বোর্ডসহ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী আগে কোনো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন কি না, নিয়ে থাকলে কোন নির্বাচনে নিয়েছিলেন, ফলাফল কী হয়েছিল এবং প্রাপ্ত ভোট কত ছিল—সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রার্থীর রাজনৈতিক দলের নামসহ দলে কোনো পদ আছে কি না এবং ওই পদের মেয়াদকাল, মাঠ পর্যায়ে প্রার্থীর জনপ্রিয়তার হার কেমন? প্রার্থীর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক কী? কোনো মামলা রয়েছে কি না? এবং প্রার্থীর ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে পুলিশ ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সূত্রে জানা গেছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা শুধু ব্যক্তিগত পরিচয় ও যোগাযোগ তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রার্থীদের রাজনৈতিক দল, দলীয় পদ ও মামলার বিষয়েও জানতে চাওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া প্রার্থীর জনপ্রিয়তার হার সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য নির্বাচনি পরিবেশ ঠিক রাখার পাশাপাশি প্রার্থীর নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার হলে তা ইতিবাচক। তবে বিগত সরকারের আমলে এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে হয়রানিতে ব্যবহার হতে দেখা গেছে।
দেশের পূর্বাঞ্চলের দুটি জেলার অন্তত ৩টি থানার ওসি গণমাধ্যমকে বলেন, নির্দেশনা পেয়ে তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। তবে মাঠে সরকারি দল বিএনপি ও কোনো কোনো এলাকায় জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরাই সক্রিয় রয়েছেন। মাঠ পর্যায় থেকে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাঠ পুলিশের ওই কর্মকর্তারা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ যারা চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে পারেন, তাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে রয়েছেন। এজন্য নিষিদ্ধ দলটির কেউ পরিচয় গোপন করেও আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হলে এখনই তাদের বিষয়ে বোঝা যাচ্ছে না।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম গণমাধ্যমকে বলেন, তথ্য নেওয়া মানেই তো আর নেতিবাচক কিছু নয়। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনেকটা ভিন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। একটা দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। আবার সেই দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ নিয়ে একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আবার সক্রিয় দলগুলোর নেতাকর্মীরাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে একটা নিরাপত্তাজনিত কারণে এই তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, এসব তথ্য ব্যবহার করে আগে বিরোধী দলের প্রার্থীকে হয়রানি করা, মামলা করা, ক্যাম্পেইন যাতে করতে না পারে, ঘরে থাকতে না পারে—এসব করা হতো। এটা তো আমরা আগে দেখেছি। এখন এই উদ্দেশ্যে যদি করে থাকে, তাহলে এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে আমার বিশ্বাস এটা নিরাপত্তাজনিত কারণেই করা হচ্ছে।
অবশ্য গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও কোন প্রার্থী কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তা স্থানীয়ভাবে মানুষের কাছে পরিচিত হতে পারে। তবে এ কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতায় কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে না’—এটি যেমন সত্য, তেমনি বাস্তবতা হলো, কোনো এলাকায় একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটিও ভোটারদের অজানা থাকবে না। আইন অনুযায়ী যোগ্যতা থাকা যে কোনো বৈধ প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। প্রার্থী যাতে নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন এবং ভোট দিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় প্রশাসন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন থেকে সাতটি ধাপে স্থানীয় নির্বাচন করার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য সময়ের কথা জানিয়ে প্রথম ধাপে তা ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছিল। তবে ১৭ সেপ্টেম্বর এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, আগামী ৬ জুনের আগে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একমত হয়েছে।
সূত্র: কালবেলা
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/-০৭




