গত দুই বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দুই বার। ক্ষমতায় ছিলো তিনটি সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পতনের আগে দলটি টানা ১৬ বছর ছিলো রাষ্ট্র ক্ষমতায়।
মানবতাবিরোধী মামলায় দণ্ডিত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতার মসনদে বসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরে চলতি বছরের শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।
এই সময়ে সরকারপ্রধানের চেয়ারে ব্যক্তি বদলের সাথে সাথে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও এসেছে বারবার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন কিংবা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে নিজ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছেন সাংবাদিকরা। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে- বারবার সরকার বদলালেও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বাস্তবতা বদলাচ্ছে না কেন?
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্টের (মিড) পর্যবেক্ষণ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর; মাত্র এই তিন মাসে সারা দেশে অন্তত ১১২টি পৃথক ঘটনায় ১৬২ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৯ জন দৈনিক পত্রিকার, ৫৩ জন টেলিভিশন এবং ২০ জন অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক। দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় এসব ঘটনা ঘটেছে।
মিডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির অন্তত ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত না হলে হামলা ও ভয় দেখানোর প্রবণতা আরও উৎসাহিত হতে পারে। প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায় বর্তমান বাংলাদেশে একজন সাংবাদিককে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে কি ধরণের পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে এ ধরণের হামলা, হুমকি ও হয়রানির কেবল একজন সংবাদকর্মীর পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার চিত্র নয় বরং জনগণের জানার অধিকার সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত। কারণ, সাংবাদিকের ওপর হামলা হলে শুধু একজন সংবাদকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বাধাগ্রস্ত হয় জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়া। সংবাদ সংগ্রহে ভয় তৈরি হলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকরা খবর প্রচার, প্রকাশ নিয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। স্থানীয়ভাবে জমি দখল, দুর্নীতি, পরিবেশ ধ্বংস, শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে তাঁদের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হতে হয়। অনেকের পেছনে থাকে না পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সহায়তা। ফলে হুমকি ও হামলার আশঙ্কায় কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ থেকেও বিরত থাকতে বাধ্য হন। এই নীরবতার মূল্য দিনশেষে দিতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে।
শুধু মফস্বলেই নয়; শহরাঞ্চলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়ার কথা রাষ্ট্রের; সোজা অর্থে বললে দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকার কথা সরকার দলের। তবে ঘটছে এর উল্টো।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মারধরে বারবার উঠে আসছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নাম। সাম্প্রতিক সময়েই ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যেমন গত ২৩ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদল। এতে ১০ সাংবাদিক আহত হন। হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের চার-পাঁচজন নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি। তবে কমিটি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেনি। থানার ভেতর হামলা হলেও নিশ্চুপ ছিল পুলিশ প্রশাসন।
গত ৪ অক্টোবর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর আবারো হামলা চালায় ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। এতে চার সাংবাদিকসহ ১০ জন আহত হন। হামলার ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ প্রশাসন ও পুলিশের কাছে রয়েছে। এরপরও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের কর্মসূচি শেষে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন ছাত্রদলের কর্মীরা। এ ঘটনায় স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম এবং প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার কুমারখালী প্রতিনিধি মমিন ইসলামসহ কয়েকজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত ও আহত হন এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
এতো গেলো মাত্র কয়েকটি উদাহরণ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসেও এমন সংকট নতুন নয়। বিভিন্ন শাসনামলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সরকারি দলগুলো বারবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও আদতে করছে তার উল্টো। বুঝাই যাচ্ছে দেশে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। সরকারকে মনে রাখতে হবে সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের জানার অধিকার সংকুচিত করা।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হবে। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে প্রতিশোধমূলক মামলা, ভয়ভীতি বা হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক নেতৃত্বও পরিবর্তিত হবে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ হওয়া উচিত প্রমাণের ভিত্তিত; রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সংবাদ প্রকাশের কারণে নয়। এ জন্য সাংবাদিকদের আইনি সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ এবং হামলার অভিযোগের প্রেক্ষিতে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি এই কাজটি করবে, সেই প্রত্যাশা।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও প্রবাসী সাংবাদিক।





