দীর্ঘ আট মাস পর পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের দ্বার। আগামী ১ নভেম্বর হাজার দুয়েক পর্যটক নিয়ে তিনটি জাহাজ ভিড়বে স্বপ্নের দ্বীপটিতে। পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
এই সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেকে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। পাশাপাশি দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সদ্য জারি করা নির্দেশনাও পর্যটকদের মেনে চলতে হবে।
এছাড়া দূর হয়েছে বিভ্রান্তিও। ভ্রমণের পাশাপাশি রাত্রিযাপনও করতে পারবেন পর্যটকরা। এ বিষয়ে আগে জারি করা আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত ২৭ অক্টোবর সংশোধন আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, ‘নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেন্টমার্টিন দ্বীপে থাকা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, সেখানে সংশোধন করা হয়েছে। এখন পুরো সময়ই পর্যটকেরা দ্বীপে থাকতে পারবেন।’
এর আগে, গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা বহাল রাখা হয়েছিল।
ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন। একই দিন ফিরে আসতে হবে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকবে। ফলে এবার পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা বাড়লেও রাতে থাকার ক্ষেত্রে গত বছরের নিয়মই বহাল থাকছে বলে ধারণা তৈরি হয়। এ নিয়ে পর্যটক, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও জাহাজ মালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। সে বিষয়েই চূড়ান্ত সংশোধিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, আগের মতোই কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এবার দ্বীপে দৈনিক পর্যটক যাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার করা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। এছাড়া এবারও সেন্টমার্টিনে যেতে পর্যটকদের ট্রাভেল পাস নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুক কালবেলাকে জানান, গতবারের মতো এবারও ট্রাভেল পাস নিয়ে পর্যটকদের দ্বীপে যেতে হবে। এ বিষয়ে কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ চালুর খবরে সেখানে আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। পর্যটননির্ভর এ দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, পর্যটক আসা শুরু হলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে দ্বীপ জুড়ে। সচল হবে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসা। বাড়বে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ।
সেন্টমার্টিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের আগমনকে সামনে রেখে দ্বীপের সব পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারে ব্যস্ত।’
টেকনাফ উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চোধুরী বলেন, সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য অনেক আকর্ষণীয় গন্তব্য। আগামী ১ তারিখ থেকে সেন্টমার্টিনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাবেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। সেন্টমার্টিনের হোটেল-মোটেল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা সভায হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেসব হোটেল-মোটেলে এখনও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়নি, শিগিগিরই ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে না করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। আপাতত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দিলেই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এসব যন্ত্র কার্যকর অবস্থায় আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তারা জানান, দ্বীপের কোনো হোটেল, রিসোর্ট বা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে অনেক সময় বাড়িতে ব্যবহৃত পানির পাইপ দিয়ে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এতে সহযোগিতা করেন। কিন্তু আগুন বড় আকার ধারণ করলে সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই সেন্টমার্টিনের সব হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে পর্যটন মৌসুমে অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সি ক্রুজ অপারেটর অনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, তিনটি জাহাজ এমবি কর্ণফুলি, বার আউলিয়া, এমবি টেকনাফ সেন্টমার্টিন নৌরুটে পর্যটক পরিবহনের ছাড়পত্র পেয়েছে। আজ সকালে পরিবেশের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভয়েস লাইসেন্স এখনো হাতে আসেনি। বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট ও সময় এখনো ঘোষণা হয়নি। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের স্থানীয় অনুমোদনও এখনো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া সেন্টমার্টিন যেতে আগ্রহী পর্যটকরা টিকেট বুকিং দিতে চাচ্ছে। অথচ এখনও ট্যুরিজম বোর্ড সফটওয়্যার ওপেন করেনি। আশা করছি, দু-একদিনের মধ্যেই এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠবো।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানান, অপার সৌন্দর্যের কক্সবাজার দেশের প্রধানতম পর্যটন জেলা। টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে পর্যটক প্রাণহানির পর্যটন মন্ত্রণালয় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, সরকার পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যটন নীতিমালার আলোকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণ নিষ্কন্ঠক করতে পর্যটক নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড যুক্ত টিকেট কেটে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে হবে। রাতে আলো, শব্দ ও বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহান বলেন, সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজারের পর্যটন স্পট গুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। তবে পর্যটকদের অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পর্যটন বিধিমালা মানতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের সচেতন হতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-২০




