শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মজীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অথচ দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, বদলি, অবসর সুবিধা ও বেতন থেকে অতিরিক্ত কর্তনসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এমপিওভুক্ত শিক্ষকসমাজ। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, পূর্বের নিয়োগব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় ১০ ও ১২ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যথাক্রমে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। এতে অভিজ্ঞ ও যোগ্য শিক্ষকদের নেতৃত্বের পর্যায়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে এবং দীর্ঘদিনের কর্ম-অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
দ্বিতীয়ত, চাকরিতে যোগদানের ১০ বছর পূর্তিতে ৯ম গ্রেডে সিনিয়র স্কেল প্রদানের ব্যবস্থা করা হোক। একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার পরও যদি তাঁর আর্থিক অগ্রগতি ও পদোন্নতির পথ সংকুচিত থাকে, তাহলে তা পেশাগত প্রেরণা ও কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যদি নিজ থানার মধ্যে বদলির সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বদলির সুযোগ নিশ্চিত করতে এত জটিলতা কেন? শিক্ষকরা কি এই দেশের নাগরিক নন? তাঁদের কি পরিবার, সন্তান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই?
একজন শিক্ষক বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থেকে দায়িত্ব পালন করলে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানা সংকট তৈরি হয়। তাই স্বচ্ছ নীতিমালা ও নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বদলির ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
চতুর্থত, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন থেকে অতিরিক্ত কর্তন বন্ধ করতে হবে। পূর্বে শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে অবসর সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণ তহবিলের জন্য ২ শতাংশ, অর্থাৎ মোট ৬ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হতো। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আরও ৪ শতাংশ অতিরিক্ত কর্তন যুক্ত হয়ে মোট কর্তনের পরিমাণ ১০ শতাংশে উন্নীত হয়।
প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক তাঁর সীমিত বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার নামে দীর্ঘদিন অর্থ জমা দেওয়ার পরও কেন অবসরকালীন পাওনা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন? কেন অবসর গ্রহণের পর একজন শিক্ষককে নিজের প্রাপ্য অর্থের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে?
আমরা চাই, শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ তহবিলের নামে অতিরিক্ত কর্তন বন্ধ করে অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতো নিয়মিত ও মর্যাদাপূর্ণ পেনশনব্যবস্থা চালু করা হোক। অন্তত বিদ্যমান কর্তনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অবসর সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষক যেন অবসরের পর আর্থিক অনিশ্চয়তায় না ভোগেন, সেটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী একজন কর্মচারী নন; তিনি জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁর জীবনমান, আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আমাদের প্রত্যাশা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের দাবিগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিবেচনা করবে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, ১০ বছর পর ৯ম গ্রেডে সিনিয়র স্কেল, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সহজ বদলি, বেতন থেকে অতিরিক্ত কর্তন বন্ধ এবং অন্যান্য চাকরিজীবীদের মতো পেনশনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষকদের প্রতিটি যৌক্তিক দাবি রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করতে হবে—এমন পরিস্থিতি আমরা চাই না। আলোচনার মাধ্যমে, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করুন। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা দিন। কারণ, শিক্ষকের জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়া মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।
শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, শিক্ষা বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে।
লেখক: মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, জাফলং, গোয়াইনঘাট, সিলেট।




